জেলার খবরবাংলাদেশ

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ, জবাবদিহির মুখে জিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রে অনুষ্ঠান নির্মাণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, শিল্পী সম্মানী ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রটির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসেন এবং নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইন ওরফে ইলন সফিরসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎপরতার তথ্যও সামনে এসেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

অনুষ্ঠান বাজেট ও ভ্রমণ ভাতা নিয়ে অভিযোগ

বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, কেন্দ্রটির কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি, কৃষি, পর্যটন, তথ্য ও প্রামাণ্য অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাজেট তৈরি এবং ভ্রমণ ভাতার নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অনুষ্ঠানের ধারণকাজে অনুষ্ঠান সহকারী ও ভিডিও এডিটরদের ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ক্যামেরা, ড্রোনসহ সরঞ্জাম ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

ভুয়া বিল-ভাউচার ও অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার নিয়েও প্রশ্ন

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের মধ্যে ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একই অনুষ্ঠান বা গ্রাফিক্স একাধিকবার প্রচার দেখিয়ে পুনর্নির্মাণ বা সংশ্লিষ্ট খাতে নতুন করে বাজেট তৈরির মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

সূত্রের দাবি, ‘ইতিহাসের এই দিনে’ নামের একটি দুই মিনিটের গ্রাফিক্স কার্ড ২৯ বার পুনঃপ্রচার দেখিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ভ্রমণ বাবদ কয়েক মাসে ৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা উত্তোলনের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এ ছাড়া একজন নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় ছুটিতে দেখিয়ে শিল্পী সম্মানীর খাতে প্রায় ৬০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শিল্পী সম্মানী নিয়ে অভিযোগ

কেন্দ্রটির কয়েকজন শিল্পীর অভিযোগ, অনুষ্ঠান ও শিল্পী সম্মানীর জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিল্পী জানান, পুনঃপ্রচার হওয়া অনুষ্ঠানকে নতুন করে নির্মাণ দেখিয়ে বাজেট তৈরির অভিযোগ রয়েছে।

তাদের আরও অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় উপস্থাপকদের নিয়মিত সুযোগ না দিয়ে অনভিজ্ঞদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সফির হোসাইনের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগও আলোচনায়

নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইনের কর্মজীবন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্রের দাবি, ২০১৫ সালে বিটিভিতে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এক কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে ভুয়া ভাউচারের সাহায্যে অর্থ উত্তোলনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ ছাড়া ওই সময়কার একটি বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে তলব করেছিল বলেও সূত্রের দাবি।

তদন্তের নির্দেশ মন্ত্রণালয়ের

বিটিভির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং শিল্পীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে বিটিভির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে এসব অভিযোগের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করে। সূত্রের তথ্যমতে, অনুষ্ঠান ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক মো. আজগর আলীকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয়।

জবাবদিহির প্রশ্ন

বিটিভি একটি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর অর্থ ব্যয়, অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং শিল্পী-কর্মীদের সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত, নথিপত্র ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button