মত - দ্বিমত

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রিয়জন হয়ে উঠছেন তারেক রহমান

ড. মো. শওকত হোসেন
ইংরেজিতে যাকে সাবঅল্টার্ন (Subaltern)  বলা হয়, বাংলায় তাকে সত্যিকারভারে কোনো একক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা মুসকিল। এর কাছাকাছি বাংলা শব্দ হতে পারে: প্রান্তিক মানুষ, অবহেলিত জনতা, শোষিত ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি। এরা এমন ধরনের মানুষ যাদের কেউ পাত্তা দেয় না, তাদের কোনো ভালোলাগা মন্দ লাগায় সমাজ বা রাষ্ট্রের কিছু আসে যায় না। কেউ তাদের কথা মন দিয়ে বা গুরুত্ব দিনে শুনতে চায় না। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা নানা সময়ে তাদের ব্যবহার করে, কিন্তু উপলক্ষ ফুরালে অদের দূরে ঠেলে দেয়। তারা থাকেন বরাবরের মতো উপেক্ষিত। সব ক্ষমতাধর পক্ষকেই তাদের সন্তুষ্টি বিধান করে চলতে হয়, এবং এতে করে তাদেরকে অনেকক্ষেত্রে পারিচয়ের ঘাটতি বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস-এও পরতে হয়। অনেক সময় সন্দেহ বসত কোনো পক্ষের কোপে পড়ে তাদের পোয়াতে হয় নানারকম দুর্ভোগ। জনবহুল গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে  বাংলাদেশের অস্থান অস্টম বলে ধরা হয়। দেশটি আবার অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। তাছাড়া সম্পদের অসম বণ্টন, মুদ্রাস্ফীতি এবং সর্বোপরি দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কবলে পরে একশ্রেণির মানুষ হয়ে পারছে অসহায়, কেউ কেউ ছিন্নমূল, এলাকা ছাড়া, বেকার, সহায়-সম্বলহীন। এইসকল মানুষদের অনেকেই বা বেশিরভাগই হয়ে ওঠে সাবঅল্টার্ন। অসহায়ত্ব ও দারিদ্রের সমস্যা এদের যাই থাকুন না কেন এদের সর্বাপেক্ষা বড় কষ্টের একটি হলো এদের কথা কেউ শুনতে চান না, কোনো কোনো বিশেষ সময়ে শুনে থাকলেও কেউ কথা রাখেন না।
জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের সমকালীন অধ্যায়ে ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটি বেশ গুণত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভারতীর স্কলার গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri Chakravonty Spivak, 1942) ১৯৮৮ সালে “ক্যান দ্যা সাবঅল্টার্ন স্পিক? (Can the Subalterin Speak?)  নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। পোস্ট কলোনিয়াল, নারীবাদী ও বিনির্মাণবাদী চিত্তক হিসেবে তার পরিচিতি থাকলেও তার এই প্রবন্ধটি উত্তরাধুনিক কিংবা বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতিবিদ্যা এবং সামগ্রিকভাবে দার্শনিক মহলে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। স্পিভাক মূলত দেখাতে চান যে, উপনিবেশিক বা যেকোনো ক্ষমাসীন শাসকগোষ্ঠী সমাজের দরিদ্র, প্রান্তিক, ক্ষমতাহীন মানুষ তথা সাবঅল্টার্নদের এমনভাবে নিস্পেসন করে রাখে যে, তারা নিজেদের প্রয়োজনে কোনো কথা বলার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়ে থাকেন। একশ্রেণির রাজনীতিবিদ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ নানা মতলবে তাদের হয়ে কথা বলতে চান বা বলার ভান করেন সেটা মূলত তাদেরই কায়েমী স্বার্থে নিজেদের মতো করে সম্পাদনা করে বলা। এটা কখনও পিওরভাবে ঐ শ্রেণির কথা হয়ে ওঠে না। এতেকরে প্রকৃত প্রস্তাবে ঐসকল মানুষের ভাগ্যের কোনো টেকসই উন্নতি হয় না।
স্পিভাকের তত্তে¡র জটিল বিশ্লেষণে না গিয়ে আমরা যদি তার মূল ভাবটি নিয়ে চিরায়ত বাংলাদেশের ঐসকল আহেলিত মানুষের দিকে তাকাই, তাহলে এই জনগোষ্ঠীর কথা বলতে না পারার বাস্তবতাটি অনেকভাবেই আমাদের চোখে পড়তে পারে। আর এটা বুঝতে হলে তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ সাধন করতে হবে। কোনো সৌখিন দরিদ্রপ্রেমি, ধান্ধাবাজ বাজনীতিবিদ বা সমাজ-উন্নয়ন সংস্থার চোখ দিয়ে নয়, একেবারে নিজের মত করে তাদের কাছে যেতে হবে, তাহলেই তাদের কথা বোঝা যাবে। তাদের মুখের ভাষা চোখ মুখের অভিব্যক্তিও অনেক সময় তাদের আনন্দ-বেদনার কাব্য বলে দেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি তেমনটি দেখতে বা শুনতে পাচ্ছেন? তিনি কি অবহেলিত বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের ভাষা উপলদ্ধি করতে পারছেন? মনে হচ্ছে পারতে শুরু করেছেন এবং অগ্রগতি বেশ আশা জাগানোরই মতো। তাঁর হয়তো সুন্দর কিছু পরিকল্পনা ও দৃঢ় সংকল্প রয়েছে। এমনই প্লান ও ডিটারমিনিশনের কথাই হয়তো তিনি দীর্ঘ নির্বাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেশে ফিরে প্রথম দিনই প্রকাশ করেছিলেন। যদিও বিস্তারিত বলেননি। আর এই না বলার বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনের ইস্তেহারে কিছু কিছু পরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করছেন। সেসব পরিকল্পনাও সমালোচকদের নিন্দা থেকে রেহাই পায়নি। তার ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কেউ কেউ ভীশন মন্দভাবে রিঅ্যান্ট করেছেন। কিন্তু সরকার গঠনের একমাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ প্রদান শুরু হয়ে গিয়েছে। সাবঅল্টার্ন বা আহেলিত প্রান্তিক মানুষের সাথে সংযোগের এটা একটা অসাধারণ উদ্যোগ। যেহেতু এই কার্ড সবচেয়ে অবহেলিত অভাবগ্রস্থদের থেকে শুরু হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে সকল সংসারের নারী প্রধানের নিকট পৌঁছানোর কথা, সেহেতু এই কর্মসূচির মাধ্যমে কথা বলতে না পারা জনতার এক বিরাট অংশই তাদের প্রাণের দাবীর কিছুটা হলেও মিটাতে পারবেন। তারা আসলে কী বলতে চায়? তারা মূলত অনেক কিছুই বলতে চায়। তারা মানুষ হিসেবে নূন্যতম মর্যাদা চান। ভাত-কাপড় ও নিরাপদ আশ্রয় চায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অধিকার চান। এরকম ব্যাসিক পর্যারের চাহিদার মধ্যে কিছুটা নিশ্চিত প্রাপ্তির বাহক এই ফ্যামিলি কার্ড। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ক্ষমতাহীন অবহেলিত নাগরিকের একটি বিরাট অংশই নারী। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে আসা হলো। একটি অভাবী পরিবারে একজন নারীকে সংসার পরিচালনার জন্য স্বামী বা সক্ষম পুরুষের আয় দিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে হয়। তাদের হাতে প্রতিমাসে একটি নগদ টাকা আশা তাদেরকে বেঁচে থাকার সংগ্রামে বেশ খানিকটা সাহসী করে তুলবে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের প্রথম দিনেই অনেক গ্রাহক বিভিন্নভাবে যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে, এমনকি আনন্দে কেউ কেউ কান্না করে দিয়েছে, দু’হাত তুলে তারেক রহমানকে দোয়া করেছে; এইসব দৃশ্যে কোনো কৃত্তিমতা ছিলনা। মানুষের হৃদয়ের নিবিড় প্রান্ত থেকে উঠে আশা এইসব অভিব্যক্তি একজন নেতাকে স্পষ্টত প্রান্তিক মানুষের কাছে এমনভাবে আপন করে তোলে যা রাজনৈতিক বক্তৃতা, ক্ষমতার মহড়া, ন্যারেটিভ নির্মাণ ইত্যাদি সকল উদ্যোগকে ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করার জন্য অসাধারণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
এ্যারিস্টটল গণতন্ত্রের মন্দ রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, এটা শেষ পর্যন্ত কতিপয় ধনীক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিভিন্ন সময়ে আমরা এর প্রমাণও দেখেছি। ক্ষমতায় গিয়ে দলীয় ধনীক শ্রেণিদের খেলাপি ক্ষণ নেওয়ার-হিড়িক পরে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নানারকম সরকারি সুযোগ চলে যায় এক ধরনের পোষ্য বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে। কিন্তু তারেক রহমান এলিট শ্রেণির দিকে নজর না দিয়ে ব্যাংকিং খাতে প্রথম সুবিধাটি দিলেন ক্ষণগ্রস্থ প্রান্তিক কৃষকদেরকে, তাদের ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ সুদসহ মৌসুফ করে দিলেন। তাছাড়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কৃষক কার্ডের। সবই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের না বলতে পারা অনেক অনেক সমস্যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। এই মানুষগুলো হয়তো সংগঠিত হয়ে কোনো দিন আন্দোলন করে হয়তো অধিকার বা দাবী আদায় করতে পারতো না। কিন্তু তাদের ঐ সমস্যা বুঝতে পারা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয়া রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনকারী রাজনৈতিক দল ও নেত্রীত্বের সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টগুণের প্রমাণ বহন করে। তারেক রহমান সরকার প্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরার বিভিন্ন পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে। এই বিষয়টি একেবারে নিম্নবিত্ত মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত মানুষের একেবারেই দৈনন্দিন সমস্যা। বাজার ব্যবস্থার কাছে সবাই সমবেশি জিম্মি হয়ে পড়ে। কিন্তু এবছরের রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য যেভাবে অন্য মাসের চাইতে কমিয়ে আনা হয়েছে তা সত্যিই বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলাফেরা সাধারণ বা প্রান্তিক মানুষের সাথে সহজভাবে মেশা, তাদের সম্মান দেওয়া এসবকিছুই রাজনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং অবহেলিত মানুষের সুবিধা অর্জনের পথ সুগম হচ্ছে। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরো উপকৃত হবেন যদি তারেক রহমানের নাম ব্যবহারকারী দলীয় নেতাকর্মীগণ তাঁর মত জনবান্ধব হন। এখনও অনেক স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী পুরোনো ধাঁচের কর্তৃত্ববাদী ভয়ের সংস্কৃতি চালু রেখেই দল চালাচ্ছেন। যার ফলে প্রান্তিক জনগণের অনেকেই সরকারের সকল ভালো উদ্যোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার যারা সুবিধা পাচ্ছেন তারাও কেউ কেউ স্থানীয় নেতাদের ব্যবহারের কারণে অসন্তুষ্টই থেকে যাচ্ছে। তারেক রহমান ক্রমশঃ তাঁর নিজগুণকে তাঁর দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে সঞ্চালন করতে পারলেই কেবল প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে সবার কাছে তাঁর ইমেজ ভালো রাখতে পারবেন।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button