Category: মত – দ্বিমত

  • ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক মেরুকরণ

    ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক মেরুকরণ

    মুহাম্মদ ইরফান সাদিক
    ইরান যুদ্ধের ধাক্কা শুধুমাত্র তেহরান, তেলআবিব বা ওয়াশিংটনের দেয়ালেই আটকে নেই, এ যুদ্ধ যেমন মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, একই সাথে এর আঁচ লেগেছে পুরো বিশ্বের রাজনীতিতেও। প্রথাগত পশ্চিমা মিত্রদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক মিত্র কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর দেশগুলো যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে।

    ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করলে তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিতে পড়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ। পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই তীব্র যে বিগত ৩০ মার্চ জি-৭ জরুরি বৈঠকে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে “সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে এখন যুদ্ধ শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে, জ্বালানি থেকে কৃষি কীটনাশক, কূটনীতি থেকে মিত্র-জোটের রাজনীতি সবদিকে। এরচেয়েও বড় মেরুকরণ এসেছে পশ্চিমা-নির্ভর রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সহায়তা, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, ও পশ্চিমা-জোট সঙ্গী দেশগুলোর রাজনীতি ও পররাষ্ট্র নীতিমালাতে।

    যুদ্ধের ফলে প্রথম মেরুকরণ এসেছে ইউরোপীয় দেশগুলোয়। বিশেষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীলতা ও সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তার ধারণা অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। অবশ্য ন্যাটোকে এমন ভঙ্গুর ও অবিশ্বস্ত জোট করে তোলার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই দায়ী। ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, “এই (ইউক্রেন) যুদ্ধ আমাদের নয়, এটা বাইডেনের যুদ্ধ।” একইসাথে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকিকে ওভাল অফিসে ডেকে নিয়ে লাইভ মিটিংয়ে রীতিমতো অপমান করেছিলেন তিনি। যা আটলান্টিকের জোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য ছিলো সতর্কতা সংকেত ও ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের শুরু। একই সাথে গ্রীনল্যাণ্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বিতর্কিত আচরণ ন্যাটোকে ওয়াশিংটন থেকে অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এমন অনির্ভরযোগ্য আচরণের ফলে, ইরান যুদ্ধের শুরুতেই স্পেন প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে মার্চের ৩ তারিখে ঘোষণা দেয় তারা এই যুদ্ধে তারা অংশগ্রহণ করবে না; একই দিন ট্রাম্প স্পেনকে পাল্টা হুমকি দেন, স্পেনের সাথে সকল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার। কিন্তু, স্পেনের সাথে সুর মিলিয়ে পরদিনই ইতালি ও যুক্তরাজ্যও যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দেয়। ফলে মার্কিন-ইউরোপীয়, বিশেষত ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুদ্ধের এক মাস পর, এপ্রিলের এক তারিখ ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ইউরোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে কোনপ্রকার সামরিক সহায়তা দেবে না, একই সাথে যুদ্ধের প্রয়োজনে কোন আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটিও ব্যবহার করতে দেবে না। একই পথে হাঁটছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যও। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সহায়তা না পেয়ে ট্রাম্প ‘যুক্তরাজ্যের সহায়তার দরকার নেই’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন। আদতে, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী বন্ধের ফলে ইউরোপে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে দ্বিগুণ। আমদানি নির্ভর ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর বেশিরভাগই রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই ওয়াশিংটনকে যুদ্ধে সহায়তা করার চেয়েও ঘরোয়া-রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ সহ নানা ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা বজায় রাখার চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘসময়ের মিত্রদের এমন সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট বার্তা দেয় ন্যাটো আর কোন নিছক পশ্চিমা মূল্যবোধের জোট নয়, বরং তা ক্রমেই শর্তসাপেক্ষ, লেনদেনমুখী এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সমীকরণে ঢুকে পড়ছে।

    যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ কানাডাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কানি বলেছেন, ইরানে হামলা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক, যদিও কানাডা ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়; তবুও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ কে কানাডা সমর্থন করে না। এর আগে ট্যারিফ ইস্যুতে তিনি সরাসরি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক উদারবাদ বা ইন্টারন্যাশনাল লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বলতে আর কিছু নেই। আমরা নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করছি।

    ওয়াশিংটন যখন যুদ্ধে ইউরোপীয় ও প্রতিবেশী মিত্রদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, তখন ট্রাম্প ভেবেছিলেন দীর্ঘদিনের এশীয় মিত্র জাপানের কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা হয়তো পাবেন। কিন্তু জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের বৈঠক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, একই সাথে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে পার্ল হার্বার আক্রমণকে মনে করিয়ে দিয়ে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছেন ট্রাম্প। জাপান, এশীয় বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশ যার ৯০% তেলই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসে। এক অর্থে, জাপানের সাথে ট্রাম্পের বৈঠক অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের মতো। তিনি ভেবেছিলেন, হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে জাপান হয়তো সহায়তা করবে। কিন্তু, জাপান এরপর দিনই ২মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ‘চাইনিজ ইউয়ান’ ব্যবহার করে নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

    ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকালীন সময়ের সকল কূটনৈতিক বৈঠকের প্যাটার্ন দেখলে একট বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি কোয়ার্সিভ বা জবরদস্তিমূলক কূটনীতি পছন্দ করেন। ইরান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রত্যেকটা মিত্রদেরকে তিনি ভেবেছিলেন জবরদস্তি করে পাশে আনবেন, কিন্তু তার একটি কূটনৈতিক বৈঠকও সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে, জবরদস্তিমূলক কূটনীতিকে কখনই কোন স্বাস্থ্যকর বা ভালো কূটনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কারণ, এই ধরনের কূটনীতি দূর্বল রাষ্ট্র ও বশ্যতা স্বীকার করবে এমন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এতোটাও রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া নয় যে জবরদস্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের বশ্যতা স্বীকার করবে, এমনকি জাপানও নয়।

    ট্রাম্পের সর্বশেষ চেষ্টা ছিলো চীনের প্রতি সাহায্য চাওয়া, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৭ মার্চ ট্রাম্প প্রকাশ্যে চীনকে হরমুজ প্রণালী খুলতে সহায়তার আহ্বান জানান। কিন্তু, বেইজিং সরাসরি কোন সামরিক, রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি না দিলেও, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেয়নি। বেইজিংয়ের তরফ থেকে ২৬শে মার্চ শান্তি-আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহবান জানানো হয়। পরবর্তীতে, চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগ্যে এপ্রিলের ১ তারিখ যুদ্ধ-বিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া ও শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বিবৃতি আসেনি।

    অন্যদিকে, যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করতে যতটা সরব তার ছিটেফোঁটাও আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দেখায়নি। এমন অভিযোগ করেছেন সৌদি আরবের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুলেমান আল আকিলী। তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মিত্র হয়েও আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সকল চিন্তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে। আরবদের নিয়ে নয়।” শুধু যে আরব রাষ্ট্রগুলোই বিশ্বাসঘাতকতা বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তাই না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধে মিসাইল ইন্টারসেপ্টর এর পরিমাণ কমে যাওয়ায়, দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকা ‘থাড ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম’ কে কোরিয়া থেকে সরিয়ে এনে ইরান যুদ্ধে কাজে লাগিয়েছে। ফলে আরবদের পাশাপাশি, দক্ষিণ কোরিয়া, যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন মার্কিনীদের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল ছিলো তারাও চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।

    আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম বিশ্বব্যাপী এতো ব্যাপক আকারে রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখছে বিশ্ব। বিগত পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে সারাবিশ্বে মোড়লপনা চালিয়ে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভরসা যোগ্য কোন মিত্র বা বন্ধুরাষ্ট্র নয় তা ইরান যুদ্ধে সকলেই টের পেয়েছে। এ যেন ইরানিয়ান প্রবাদেরই প্রতিফলন, “আমেরিকা যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন নেই।”

    শিক্ষার্থী
    আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

    সিনিয়র ফরেন পলিসি এনালিস্ট
    ইয়ুথ পলিসি ফোরাম।

  • প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রিয়জন হয়ে উঠছেন তারেক রহমান

    প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রিয়জন হয়ে উঠছেন তারেক রহমান

    ড. মো. শওকত হোসেন
    ইংরেজিতে যাকে সাবঅল্টার্ন (Subaltern)  বলা হয়, বাংলায় তাকে সত্যিকারভারে কোনো একক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা মুসকিল। এর কাছাকাছি বাংলা শব্দ হতে পারে: প্রান্তিক মানুষ, অবহেলিত জনতা, শোষিত ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি। এরা এমন ধরনের মানুষ যাদের কেউ পাত্তা দেয় না, তাদের কোনো ভালোলাগা মন্দ লাগায় সমাজ বা রাষ্ট্রের কিছু আসে যায় না। কেউ তাদের কথা মন দিয়ে বা গুরুত্ব দিনে শুনতে চায় না। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা নানা সময়ে তাদের ব্যবহার করে, কিন্তু উপলক্ষ ফুরালে অদের দূরে ঠেলে দেয়। তারা থাকেন বরাবরের মতো উপেক্ষিত। সব ক্ষমতাধর পক্ষকেই তাদের সন্তুষ্টি বিধান করে চলতে হয়, এবং এতে করে তাদেরকে অনেকক্ষেত্রে পারিচয়ের ঘাটতি বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস-এও পরতে হয়। অনেক সময় সন্দেহ বসত কোনো পক্ষের কোপে পড়ে তাদের পোয়াতে হয় নানারকম দুর্ভোগ। জনবহুল গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে  বাংলাদেশের অস্থান অস্টম বলে ধরা হয়। দেশটি আবার অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। তাছাড়া সম্পদের অসম বণ্টন, মুদ্রাস্ফীতি এবং সর্বোপরি দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কবলে পরে একশ্রেণির মানুষ হয়ে পারছে অসহায়, কেউ কেউ ছিন্নমূল, এলাকা ছাড়া, বেকার, সহায়-সম্বলহীন। এইসকল মানুষদের অনেকেই বা বেশিরভাগই হয়ে ওঠে সাবঅল্টার্ন। অসহায়ত্ব ও দারিদ্রের সমস্যা এদের যাই থাকুন না কেন এদের সর্বাপেক্ষা বড় কষ্টের একটি হলো এদের কথা কেউ শুনতে চান না, কোনো কোনো বিশেষ সময়ে শুনে থাকলেও কেউ কথা রাখেন না।
    জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের সমকালীন অধ্যায়ে ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটি বেশ গুণত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভারতীর স্কলার গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri Chakravonty Spivak, 1942) ১৯৮৮ সালে “ক্যান দ্যা সাবঅল্টার্ন স্পিক? (Can the Subalterin Speak?)  নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। পোস্ট কলোনিয়াল, নারীবাদী ও বিনির্মাণবাদী চিত্তক হিসেবে তার পরিচিতি থাকলেও তার এই প্রবন্ধটি উত্তরাধুনিক কিংবা বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতিবিদ্যা এবং সামগ্রিকভাবে দার্শনিক মহলে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। স্পিভাক মূলত দেখাতে চান যে, উপনিবেশিক বা যেকোনো ক্ষমাসীন শাসকগোষ্ঠী সমাজের দরিদ্র, প্রান্তিক, ক্ষমতাহীন মানুষ তথা সাবঅল্টার্নদের এমনভাবে নিস্পেসন করে রাখে যে, তারা নিজেদের প্রয়োজনে কোনো কথা বলার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়ে থাকেন। একশ্রেণির রাজনীতিবিদ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ নানা মতলবে তাদের হয়ে কথা বলতে চান বা বলার ভান করেন সেটা মূলত তাদেরই কায়েমী স্বার্থে নিজেদের মতো করে সম্পাদনা করে বলা। এটা কখনও পিওরভাবে ঐ শ্রেণির কথা হয়ে ওঠে না। এতেকরে প্রকৃত প্রস্তাবে ঐসকল মানুষের ভাগ্যের কোনো টেকসই উন্নতি হয় না।
    স্পিভাকের তত্তে¡র জটিল বিশ্লেষণে না গিয়ে আমরা যদি তার মূল ভাবটি নিয়ে চিরায়ত বাংলাদেশের ঐসকল আহেলিত মানুষের দিকে তাকাই, তাহলে এই জনগোষ্ঠীর কথা বলতে না পারার বাস্তবতাটি অনেকভাবেই আমাদের চোখে পড়তে পারে। আর এটা বুঝতে হলে তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ সাধন করতে হবে। কোনো সৌখিন দরিদ্রপ্রেমি, ধান্ধাবাজ বাজনীতিবিদ বা সমাজ-উন্নয়ন সংস্থার চোখ দিয়ে নয়, একেবারে নিজের মত করে তাদের কাছে যেতে হবে, তাহলেই তাদের কথা বোঝা যাবে। তাদের মুখের ভাষা চোখ মুখের অভিব্যক্তিও অনেক সময় তাদের আনন্দ-বেদনার কাব্য বলে দেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি তেমনটি দেখতে বা শুনতে পাচ্ছেন? তিনি কি অবহেলিত বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের ভাষা উপলদ্ধি করতে পারছেন? মনে হচ্ছে পারতে শুরু করেছেন এবং অগ্রগতি বেশ আশা জাগানোরই মতো। তাঁর হয়তো সুন্দর কিছু পরিকল্পনা ও দৃঢ় সংকল্প রয়েছে। এমনই প্লান ও ডিটারমিনিশনের কথাই হয়তো তিনি দীর্ঘ নির্বাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেশে ফিরে প্রথম দিনই প্রকাশ করেছিলেন। যদিও বিস্তারিত বলেননি। আর এই না বলার বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনের ইস্তেহারে কিছু কিছু পরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করছেন। সেসব পরিকল্পনাও সমালোচকদের নিন্দা থেকে রেহাই পায়নি। তার ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কেউ কেউ ভীশন মন্দভাবে রিঅ্যান্ট করেছেন। কিন্তু সরকার গঠনের একমাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ প্রদান শুরু হয়ে গিয়েছে। সাবঅল্টার্ন বা আহেলিত প্রান্তিক মানুষের সাথে সংযোগের এটা একটা অসাধারণ উদ্যোগ। যেহেতু এই কার্ড সবচেয়ে অবহেলিত অভাবগ্রস্থদের থেকে শুরু হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে সকল সংসারের নারী প্রধানের নিকট পৌঁছানোর কথা, সেহেতু এই কর্মসূচির মাধ্যমে কথা বলতে না পারা জনতার এক বিরাট অংশই তাদের প্রাণের দাবীর কিছুটা হলেও মিটাতে পারবেন। তারা আসলে কী বলতে চায়? তারা মূলত অনেক কিছুই বলতে চায়। তারা মানুষ হিসেবে নূন্যতম মর্যাদা চান। ভাত-কাপড় ও নিরাপদ আশ্রয় চায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অধিকার চান। এরকম ব্যাসিক পর্যারের চাহিদার মধ্যে কিছুটা নিশ্চিত প্রাপ্তির বাহক এই ফ্যামিলি কার্ড। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ক্ষমতাহীন অবহেলিত নাগরিকের একটি বিরাট অংশই নারী। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে আসা হলো। একটি অভাবী পরিবারে একজন নারীকে সংসার পরিচালনার জন্য স্বামী বা সক্ষম পুরুষের আয় দিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে হয়। তাদের হাতে প্রতিমাসে একটি নগদ টাকা আশা তাদেরকে বেঁচে থাকার সংগ্রামে বেশ খানিকটা সাহসী করে তুলবে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের প্রথম দিনেই অনেক গ্রাহক বিভিন্নভাবে যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে, এমনকি আনন্দে কেউ কেউ কান্না করে দিয়েছে, দু’হাত তুলে তারেক রহমানকে দোয়া করেছে; এইসব দৃশ্যে কোনো কৃত্তিমতা ছিলনা। মানুষের হৃদয়ের নিবিড় প্রান্ত থেকে উঠে আশা এইসব অভিব্যক্তি একজন নেতাকে স্পষ্টত প্রান্তিক মানুষের কাছে এমনভাবে আপন করে তোলে যা রাজনৈতিক বক্তৃতা, ক্ষমতার মহড়া, ন্যারেটিভ নির্মাণ ইত্যাদি সকল উদ্যোগকে ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করার জন্য অসাধারণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
    এ্যারিস্টটল গণতন্ত্রের মন্দ রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, এটা শেষ পর্যন্ত কতিপয় ধনীক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিভিন্ন সময়ে আমরা এর প্রমাণও দেখেছি। ক্ষমতায় গিয়ে দলীয় ধনীক শ্রেণিদের খেলাপি ক্ষণ নেওয়ার-হিড়িক পরে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নানারকম সরকারি সুযোগ চলে যায় এক ধরনের পোষ্য বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে। কিন্তু তারেক রহমান এলিট শ্রেণির দিকে নজর না দিয়ে ব্যাংকিং খাতে প্রথম সুবিধাটি দিলেন ক্ষণগ্রস্থ প্রান্তিক কৃষকদেরকে, তাদের ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ সুদসহ মৌসুফ করে দিলেন। তাছাড়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কৃষক কার্ডের। সবই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের না বলতে পারা অনেক অনেক সমস্যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। এই মানুষগুলো হয়তো সংগঠিত হয়ে কোনো দিন আন্দোলন করে হয়তো অধিকার বা দাবী আদায় করতে পারতো না। কিন্তু তাদের ঐ সমস্যা বুঝতে পারা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয়া রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনকারী রাজনৈতিক দল ও নেত্রীত্বের সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টগুণের প্রমাণ বহন করে। তারেক রহমান সরকার প্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরার বিভিন্ন পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে। এই বিষয়টি একেবারে নিম্নবিত্ত মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত মানুষের একেবারেই দৈনন্দিন সমস্যা। বাজার ব্যবস্থার কাছে সবাই সমবেশি জিম্মি হয়ে পড়ে। কিন্তু এবছরের রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য যেভাবে অন্য মাসের চাইতে কমিয়ে আনা হয়েছে তা সত্যিই বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য।
    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলাফেরা সাধারণ বা প্রান্তিক মানুষের সাথে সহজভাবে মেশা, তাদের সম্মান দেওয়া এসবকিছুই রাজনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং অবহেলিত মানুষের সুবিধা অর্জনের পথ সুগম হচ্ছে। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরো উপকৃত হবেন যদি তারেক রহমানের নাম ব্যবহারকারী দলীয় নেতাকর্মীগণ তাঁর মত জনবান্ধব হন। এখনও অনেক স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী পুরোনো ধাঁচের কর্তৃত্ববাদী ভয়ের সংস্কৃতি চালু রেখেই দল চালাচ্ছেন। যার ফলে প্রান্তিক জনগণের অনেকেই সরকারের সকল ভালো উদ্যোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার যারা সুবিধা পাচ্ছেন তারাও কেউ কেউ স্থানীয় নেতাদের ব্যবহারের কারণে অসন্তুষ্টই থেকে যাচ্ছে। তারেক রহমান ক্রমশঃ তাঁর নিজগুণকে তাঁর দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে সঞ্চালন করতে পারলেই কেবল প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে সবার কাছে তাঁর ইমেজ ভালো রাখতে পারবেন।
    লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
  • শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো ও একজন শিক্ষকের গল্প

    শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো ও একজন শিক্ষকের গল্প

    এবিএনএ: রবীন্দ্রনাথ আমার শিক্ষাগুরু ছিলেন। এটা আমার জীবনের অত্যন্ত আশির্বাদময় ঘটনা বলে আমি মনে করি। আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় তাঁর সরাসরি পাঠ-গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। আমার হাতে খড়ি হয়েছে যাঁদের হাতে তিনি তাঁদের একজন। সত্যিকারের খড়ি দিয়েই আমার লেখালেখির যাত্রা শুরু হয়েছিলো। বাঁশের খড়ি বা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো কমল, দোয়াত ভরা কয়লা গুলিয়ে বানানো কালি, আর তাল পাতার সরু লম্বা দুই পৃষ্ঠদেশ- এই ছিলো আমাদের স্কুলের বর্ণমালা লিখনের প্রাথমিক উপকরণ। শ্রেণি কক্ষে বসার সৌভাগ্য তখনও হয় নি। কখনও বৃক্ষতলে-রবীন্দ্রনাথ ও রুশোর কাক্সিক্ষত প্রকৃতির কোলে, আবার ঝড়-বৃষ্টি-খড়ায় আমাদের ঠাই হতো বড়োজোর বারান্দায়। প্রথম- শ্রেণি বা যাকে তখন বড় ওয়ান ক্লাস বলা হতো, তার পূর্বে শ্রেণি কক্ষে বসার নিয়ম আমাদের স্কুলে ছিলো না। এর অন্যতম কারণ হলো পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক। আমরা যে শিক্ষা- সরঞ্জাম ব্যবহার করতাম তার সবকিছু, বিশেষকরে দোয়াতের কালি ও তার মধ্যে কঞ্চির কলম ডুবানো- বের করা এবং তালের পাতায় লিখে আবার কাপড় (ন্যাকড়া) দিয়ে মুছে ফেলা- লিখন সংগ্রামের ইত্যাদি কর্ম- সম্পাদনে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা ঝুঁকি থাকাটা স্বাভাবিক। তাছাড়া লিখন- প্রক্রিয়ার যে পদ্ধতি বলা হলো তা কোনো চেয়ার-টেবিল, ব্যাঞ্চ ব্যবহার করে সম্পন্ন করার চাইতে মৃত্তিকার কোলে বসে সম্পাদন করাই অধিকতর সুবিধাজনক ছিলো।
    যাইহোক, আমার শিক্ষকের প্রসঙ্গে আসা যাক। বর্ণমালার বর্ণালী জ্ঞান দখল করার দারুন সেই সাধন-যজ্ঞে আমরা সাধনাকারী ছিলাম; প্রতিদিনের পাঠ শেষে আমাদের অবস্থা কম-বেশি ‘বøাক-হোলি’ খেলার মতো হতো। হাতে, জামা-কাপড়ে, এমনকি মুখমন্ডলেও এক একজনের লেগে যেতো কালো কালির নানা আকারের দাগ। ‘দাগ থেকে দারুন কিছু’ হতে পারে- এটা তখনও না বুঝলেও ফলত তাই হয়েছে। আমরা বর্ণমালার জ্ঞান হাতে-কলমে অর্জন করেছি। গায়ে লাগা দাগগুলো মুছে ফেলতাম, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে প্রতিদিন যে দাগ পরতো তা আজও মুছে যায় নি। এই হৃদয়ে লিখনের মহৎ কাজটি করতে, বর্ণমালা শিখার সাধনায় যিনি সাধন-গুরু হিসেবে সযতেœ আমাদের সাথে থাকতেন তিনি হলেন আমার শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ঢালী, আমাদের রবি স্যার। তাঁর হাতে, জামায় লেগে যাওয়া আমাদের কালির দাগ আজও আমার চোখে ভাসে।
    বর্ণমালা শিখানোর সাথে সাথে রবি স্যার আমাদের আরও অনেক কিছু শিখাতেন। সুন্দর হাতের লেখা কীভাবে লিখতে হয়, তা তখন থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের তিনি শিখিয়েছেন; অংকন শিক্ষকও ছিলেন তিনি। আমাদের অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বড় অংকন-শিল্পী ও লিখন শিল্পী বলতে তাঁকেই বুঝাতো। তার প্রমাণ হলো ব্যানার লেখা, কোনো দেয়ালে বা ক্যানভাসে কেনো চিত্র অংকন করা, অথবা সখের বসে কোনো রুমাল, হাতপাখা, চাদর, এমনকি নক্শি কাঁথায় নক্শা আকার জন্যও রবি স্যারকেই সবচেয়ে বেশি কাক্সিক্ষত মনে করা হতো। তবে প্রসঙ্গত বলছি, তাঁর নিকট থেকে অক্ষরজ্ঞান শিখলেও খুব ভালো হস্ত লিখন ও চিত্রাঙ্কন শিল্প বিষয়ক দীক্ষা আমি একেবারেই নিতে পারিনি। তার সকল প্রচেষ্টা- প্ররিশ্রম ব্যর্থ ঘোষণা করে আজও আমি লেখনিতে খুবই গরীব, অংকনে অভাবনীয়ভাবে অক্ষম। তবে হ্যাঁ, স্যার আনুসঙ্গিক আরও কিছু শিক্ষা দিতে চেষ্ঠা করেছেন, যার কিছু কিছু আমি অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছি, যেমন কীভাবে বন্ধু বানাতে হয়, ভালো সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়, বিবাদ মিটিয়ে সাময়িকভাবে হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়, অল্প পয়সায় কীভাবে নাস্তা (টিফিন) করা যায়, এমনকি পয়সা না থাকলেও কীভাবে ক্ষুধা মিটানো যায় ইত্যাদি।
    আমি যে, বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছি সেই বিদ্যালয় ও তার বিদ্যা দাতাগণ যেমন অনেকেই গরীব ছিলেন, শিক্ষার্থীদেরও সিংহভাগ ছিলো গরীব। টিফিনের সময় কিছু কিনে খাবার যোগ্যতা যখন আমাদের না থাকতো তখন বরি স্যারের বুদ্ধি অনুযায়ী আমরা কেউ কেউ আমলকি চিবিয়ে তারপর পেট ভরে টিউবয়েলের পানি খেতাম। এ এক দারুন অভিজ্ঞতা, পানি তখন অমৃতের মতো উপভোগ্য মনে হতো। আর এজন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাবও বোধকরি পূর্ণ হতো।
    গুরু রবীন্দ্রনাথের কথা এখন থাক। তাঁকে নিয়ে আরও অনেক গল্প আছে। নতুন করে আরও অনেক গল্প তৈরি হবারও অবকাশ আছে। কেননা তিনি এখনও জীবিত আছেন। তবে কীভাবে তিনি জীবন যাপন করছেন, আমাদের ক্ষুধা মিটানোর বুদ্ধিদাতা নিজের বৃদ্ধ বয়সে কীভাবে ক্ষুধা মিটাচ্ছেন সেই গল্পে একটু পরে আসছি। তার পূর্বে বলে রাখছি যে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা করতে গিয়ে এরকম অনেক নিবেদিত শিক্ষাগুরুর অকৃত্রিম অবদান মিশে আছে আমার এবং আমাদের অনেকের জীবনে। আজ যারা সমাজে নেত্রীত্ব দিচ্ছেন, বড় বড় পদ-পদবি ধারণ করে গর্বিত জীবন যাপন করছেন, সামাজিক সম্মান অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তাদের জীবনেও এরকম অনেক রবি স্যারের গল্প কম-বেশি নানাভাবে গ্রথিত আছে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই পিছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। ভালোবাসা বলি আর স্বার্থ বলি তার গতি সর্বদাই যেন সামনের দিকে। যে শিক্ষকগণ আমাদেরকে নানাভাবে দক্ষ করে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব ও নেত্রীত্ব দিতে, নীতি নির্ধারণ করতে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন, তাদের জীবন-মান সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কতটুকু রক্ষা করা হচ্ছে? অন্যান্য চাকরি বা পেশার সাথে তুলনা করলে আমাদের দেশের শিক্ষকগণ এমন কি কি পাচ্ছেন যা দিয়ে তিনি নিজের সন্তানদের লেখাপড়া ও সামাজিক অর্থনৈতিক চাহিদা মিটাতে পারছেন? সামগ্রিকভাবে এর উত্তর নেতিবাচক। তাই স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ব্যক্তিগত কোচিং থেকে গুরু করে নানারকম বৈষয়িক কাজের সাথে, এমনকি রাজনীতির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্বল্প সুবিধাদিতে সীমাবদ্ধ না থাকতে পেরে কেউ কেউ বুর্জোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (private university)  ভাড়ায় খেটে ক্ষুণিবৃত্তি চরিতার্থ করছেন।
    বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের সামাজিক তথাকথিত মর্যাদার সাথে মিলিয়ে আর্থিক সুবিধাদি না দেওয়াই এভাবে মেধা বা শ্রম বিক্রি হয়ে যাবার মূল কারণ। আসলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কোনো পর্যায়ের শিক্ষকগণই তাদের বেতন-ভাতা বা সুবিধাদিতে সন্তুষ্ট নন। তাদেরকে তথাকথিত সম্মানের মত্তকা দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নিম্ন শ্রেণির করে রাখা হয়েছে। একজন অধ্যাপকের কি গাড়ী থাকা অনৈতিক? তার গবেষণার জন্য বরাদ্ধ কেমন থাকা উচিৎ? কিন্তু বর্তমান বেতন কাঠামোতে সেই সুযোগ নেই। এঁদের অনেক নবীন ছাত্র-ছাত্রী আজ সরকারি প্রশাসন বা অন্য কিছু ক্যাডারে চাকুরি করে চকচকে গাড়ীতে চড়ে মাঝে মধ্যে শিক্ষকদের সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে অথবা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেও আসেন। তখন এই শ্রেণি বৈষম্য ও রাষ্ট্রের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়।
    একজন শিক্ষক যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের তথা অন্যের সন্তানদের দক্ষতা অর্জনের দিকেই নিরলসভাবে নিবেদিত থাকেন, নিজের বৈষয়িক উন্নতির দিকে নজর না দেন, কেবল তথাকথিত সম্মান নিয়েই সরল জীবন যাপন করেন তাহলে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অবস্থা কীরকম হতে পারে? অবসর জীবনও তাদের কেমন কাটে? আমাদের দেশের শিক্ষকদের বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী বিজ্ঞ বাজেট প্রণেতা ও সরকারি নীতি নির্ধাকণগণ কি তা কখনও ভেবে দেখেন? সুযোগ পেলেই শিক্ষকদের দ্বায়িত্ব-কর্তব্য, যোগ্যতা, এমনকি চরিত্র নিয়েও কত কথা বলা হয়। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বদলে এই সকল ক্ষমতাধর প্রশাসকগণই আবার রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত নানা রকম জ্ঞান নিতে বিভিন্ন দেশে প্রমোদ ভ্রমনে যান। আর সেখান থেকে ফিরে, কখনও বিশ্বমানের, কখনও প্রযুক্তি বা কারিগরি দক্ষতা মুখি, আবার কখনও সৃজনশীল ইত্যাদি পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেন। শিক্ষার সত্যিকারের উন্নতি যদি তাদের মাথায় কাজ করতো তাহলে যাতে করে সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ নাগরিকদের সিংহভাগই শিক্ষক হতে চাইবেন এই পরিবেশ তারা নিশ্চিত করতে চাইতেন। কিন্তু কোনো বাজেটেই শিক্ষার জন্য কাক্সিক্ষত বরাদ্ধ রাখা হয় না, বরং শিক্ষার সাথে অন্য কিছু বিষয় জুড়ে দিয়ে, এমনকি ঐ সকল কর্তা-ব্যক্তিদের বিদেশ সফরের ব্যয়ভারও মিলিয়ে ফেলে এক সুভঙ্করের ফাঁকির ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার উন্নতিতে সবচেয়ে যাঁদের জন্য ভাবা দরকার সেই শিক্ষকদের অবস্থার কোনো কাঙ্খিত উন্নতি হয় না।
    তবুও অনেক দক্ষ ব্যক্তি ভালোবেসে এক ধরনের মানবসেবার ব্রত নিয়েই শিক্ষকতায় আসেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই দিন শেষে দুর্ভোগের স্বীকার হন। আমার বরি স্যারও তেমন মিশনধারী একজন শিক্ষক। এখন তিনি কৃষক। পিতার সম্পত্তির যেটুকু তিনি পেয়েছেন সেখানে আবাদ করে জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি যাদেরকে অক্ষর জ্ঞান দিয়ে শিক্ষাজীবনের ভীত তৈরি করে দিয়েছেন, তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে অনেক নীতি নির্ধারণ করেন; সেই দোয়াতের কালিও এখন আর তাদের হাতে লাগে না- যন্ত্র দিয়েই লিখতে পারেন। কিন্তু বরি স্যারদের গায়ে তখন যেমন কালি মাখা থাকতো- এখনও তাঁদের গায়ে কাঁদা লাগাতে হয়!
    লেখক:- ড. মো. শওকত হোসেন
    অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
  • “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান”: জনাব তারেক রহমানের ভাষণ ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

    “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান”: জনাব তারেক রহমানের ভাষণ ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

    এবিএনএ: ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দুই লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে আমেরিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারণ করেছিলেন “আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম।” এই উক্তিটি কেবল একটি আবেগঘন বাক্য ছিল না; এটি ছিল ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের এক চূড়ান্ত প্রকাশ।

    এই ভাষণের মাধ্যমে আমেরিকার সর্বজনীন মানবাধিকার ও সমতার পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সেদেশের সিভিল রাইটস অ্যাক্ট (১৯৬৪) ও ভোটিং রাইটস অ্যাক্ট (১৯৬৫) প্রণয়নে। রাজনীতির ইতিহাসে এটি এমন একটি ভাষণ, যেখানে নৈতিক আবেদন ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল।

    এই ঐতিহাসিক ঘটনার বাষট্টি বছর পর, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের উপস্থিতিতে নিজের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচ্চারণ করলেন “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান।” অনুষ্ঠানটি ছিল একটি বরণ অনুষ্ঠান—কোন প্রতিবাদ সভা বা রাজনৈতিক সমাবেশ নয়। সঙ্গত কারণেই তিনি তাঁর এই “প্ল্যান”-এর বিস্তারিত বিবরণ এই ভাষণে দেননি। তবু তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ ও উচ্চারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে নতুন বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক-নৈতিক রূপরেখার অভাস পাওয়া যায়।

    জনাব তারেক রহমান বেশ পরিষ্কার কন্ঠেই বলেছেন, “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।” কোন রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে এমন কথা প্রত্যাশিত হলেও, তাঁর ভাষণের শব্দচয়ন ও ভঙ্গি ইঙ্গিত দেয় যে, এই বক্তব্য নিছক আনুষ্ঠানিক নয়। তাঁর “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণটির অন্তর্নিহিত দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর রাজনৈতিক-নৈতিক রূপরেখা অন্তত: দশটি মৌলিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হল:

    ১/ অকর্তৃত্ববাদী মনস্তত্ত্ব: সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ ‘আমিত্বে’ ভরপুর কর্তৃত্ববাদী শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। জনাব তারেক রহমানের ভাষণে এই আমিত্ব ছিল অনুপস্থিত। রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তাঁর ভাষণে তিনি “আমরা” এবং “সকলে মিলে” – এ ধরনের শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব – যেখানে আমরা সকলে মিলে কাজ করব, আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলব।” লক্ষণীয় যে, “আমি” শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছেন কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায়, যেমন রাব্বুল অলামীনের অশেষ রহমতে আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি” বা “এখান থেকে আমি আমার মা, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব।” ভাষা ব্যবহারে আমিত্বের এই অনুপস্থিতি যুক্তিসঙ্গতভাবেই ইঙ্গিত দেয় যে, জনাব তারেক রহমান অকর্তৃত্ববাদী মনোভাব ধারণ করেন এবং সম্ভাব্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার বদলে সম্মিলিত মতামত এবং অংশগ্রহণমূল রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে চান।

    ২/ বাকস্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: জনাব তারেক রহমান তাঁর ভাষণের প্রথম অংশেই বাংলাদেশের মানুষের বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন “আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়।” স্বৈরতান্ত্রিক সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন “শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরীহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন।” অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা রক্ষার জন্য দেশের মানুষের আকাঙ্খা ও আত্মত্যাগের বিষয়টিকে তিনি একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে দেখছেন। কাজেই, মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার একটি অঙ্গীকার তাঁর নতুন বাংলাদেশের রূপরেখায় থাকবে – এই প্রত্যাশা খুবই যৌক্তিক।

    ৩/ গণতান্ত্রিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ: এ বিষয়টি লক্ষ্ করার মত যে, জনাব তারেক রহমানের ভাষণে গণতন্ত্র ও অর্থনীতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসাবে আসেনি, বরং এ দু’টো বিষয় সবসময় একসাথে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি বলেছেন “এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। এই দেশের মানুষ তাঁদের গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। …গণতান্ত্রিক ভিত্তি ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরে যাতে এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারি।” এখান থেকে বোঝা যায়, তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছেন যে, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া কার্যকর ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র ও অর্থনীতিকে একসাথে বিবেচনা করার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর রাজনৈতিক রূপরেখাকে আরও বাস্তবমুখী করে তুলবে বলে আশা করা যায়।

    ৪/ নারীর অধিকার ও প্রত্যাশা সুপ্রতিষ্ঠিত করা: সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উগ্রবাদীর কর্মকাণ্ডের কারণে নারীর অধিকার ইস্যুটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় খুবই জাজ্বল্যমান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আশার কথা হল, জনাব তারেক রহমানের ভাষণে নারীর অধিকার ইস্যুটি গতানুগতিক ধারায় আসেনি, বরং তিনি এর সাথে যুক্ত করেছেন চমৎকার একটি ধারণা ‘নারীর প্রত্যাশা’। তিনি তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন, নারীর অধিকার ও উন্নয়ন হবে নারীর প্রত্যাশা অনুযায়ী; নারীর অধিকার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো নির্ধারিত হবে তাঁদের দ্বারাই – কোন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার দিয়ে নয়। এই প্রগতির ইঙ্গিতবাহী অভিনবত্ব খুবই আশা জাগানিয়া একটি বিষয়।

    ৫/ নাগরিকের সর্বজনীন ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: স্বৈরতান্ত্রিক-ফ্যাসিস্ট শাসনামলের গুম-খুনের কথা উল্লেখ করে জনাব তারেক রহমান তাঁর ভাষণে সেই রক্তের ঋণ শোধ করতেই এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যেখানে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-পেশা-শ্রেণি নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা যাবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই নিরাপত্তা হতে হবে এতটাই সার্বিক যতটা সার্বিক নিরাপত্তা একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য প্রত্যাশা করেন। কাজেই, জনাব তারেক রহমানের “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণ থেকে আমরা এই প্রত্যাশা করতে পারি যে, তাঁর রাজনৈতিক রূপরেখায় নাগরিকের সর্বজনীন এবং সার্বিক নিরাপত্তা একটি মৌলিক ও আবশ্যিক বিষয় হিসাবে বিদ্যমান আছে।

    ৬/ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনায় উজ্জীবিত ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম: জনাব তারেক রহমান তাঁর ভাষণে ১৯৭১ সালের লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ এর সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং বিশেষভাবে ২০২৪ এর গণঅভ্যূত্থানের কথা স্মরণ করে বলেন, এগুলোর লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে আনার পাশাপাশি আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশ ও এর জনগণকে রক্ষা করা। জনগণের এই রক্তাক্ত বিপ্লবসমূহ সম্পর্কে জনাব তারেক রহমানের দৃপ্ত উচ্চারণ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, যে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য তিনি তাঁর “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” – এর অবতারণা করেছেন, তাঁর ভিত্তিমূলে রয়েছে এই বিপ্লবসমূহের চেতনা যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে প্রেরণা যোগাবে।

    ৭/ ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক-উদারনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার সমন্বয়: বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসাধারণ একই সাথে ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ বিরোধী। তাঁরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সমতার ভিত্তিতে শান্তিতে বসবাসে আগ্রহী। তারেক রহমানের “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণে এই জন-অভিপ্রায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলার প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে তিনি তাঁর ভাষণ শুরু করে এক পর্যায়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “আমরা সকলে নবী করিম (সা.) -এর যে ন্যায়পরায়ণতা, সেই ন্যায়পরায়ণতার আলোকে আমরা দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।” ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা করার এই প্রতিজ্ঞার পাশাপাশি তিনি এটিও নিশ্চিত করেছেন যে, দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে তিনি উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবেন না; বরং, সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে সমতা ও সম-অধিকারের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন। তিনি তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন “এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই সকলে মিলে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন “যেকোন ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদ থাকে – এই হোক আমাদের চাওয়া আজকে।” কাজেই, তাঁর ভাষণ থেকে এমন অনুমান করা যৌক্তিক যে, ইসলামী মূল্যবোধকে ধারণ করে সকল ধর্মমতের মানুষের সমতা ও সম-অধিকারের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে একটি আধুনিক ও উদারনৈতিক রাষ্ট্র কায়েম করা তাঁর ‘প্ল্যান’-এর অংশ।

    ৮/ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ভাবনা: জনাব তারেক রহমান তাঁর “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণে যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের কথা বলেছেন, সেখানে তিনি তাঁর ভাষায় “আরো যেসব জাতীয় নেতৃবৃন্দ আছেন” তাঁদেরকে নিয়েই সেই বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা বলেছেন। কাজেই, তাঁর রাষ্ট্র ভাবনায় কেবল তিনি বা তাঁর দল নয়, বরং অন্তর্ভুক্ত আছে সকল দল। শুধুমাত্র যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলমতকেই তিনি তাঁর পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করছেন এমন নয়, তিনি চাইছেন সকল শ্রেণি-পেশা-ধর্মের মানুষকে এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করতে। তিনি যেমন রাষ্ট্র গঠনে তরুণদের অর্ন্তভূক্তি ও অংশগ্রহণের কথা জোর দিয়ে বলেছেন, তেমনই তাঁর এই অর্ন্তভূক্তিমূলক পরিকল্পনা থেকে বাদ যায়নি চল্লিশ লক্ষ প্রতিবন্ধী মানুষও। রাষ্ট্র গঠনে সকলের এই অন্তর্ভুক্তি প্রকারন্তরে রাষ্ট্রের উপর জনগণের মালিকানাকেই প্রতিফলিত করে।

    ৯/ রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা: জনাব তারেক রহমানের ভাষণে বারবার ধৈর্যধারণের কথা এসেছে। সকল সমস্যাকে তিনি ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করার পরামর্শ দিয়েছেন; উস্কানির মুখেও সকলকে ধীর এবং শান্ত থাকতে অনুরোধ করেছেন। তাঁর ভাষণও ছিল সম্পূর্ণরূপে উস্কানিমুক্ত যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, এমনকি তাঁর ও তাঁর পরিবার যে শক্তির নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও তিনি কোন কঠোর শব্দচয়ন করেননি। এ থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর নতুন বাংলাদেশের রূপরেখায় এমন একটি বাংলাদেশ থাকবে যেখানে পারস্পরিক হানাহানির বদলে রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা পাবে।

    ১০/ শান্তিই রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য: বাংলাদেশের জনগণের যত সংগ্রাম, যত ত্যাগ আছে, তার মূল লক্ষ্য শান্তিতে বসবাস করার চিরাচরিত প্রত্যাশা। আর জনগণের এই চিরাচরিত প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি করে জনাব তারেক রহমান তাঁর ভাষণে দৃপ্তভাবে উচ্চারণ করেন “আমরা দেশে শান্তি চাই। আমরা দেশে শান্তি চাই। আমরা দেশে শান্তি চাই।” যে শান্তির কথা তিনি এখানে বলেছেন, তা নিরাপদ নাগরিক জীবনের প্রতিশ্রুতি বহন করে; এটি এমন এক সামাজিক অবস্থা, যেখানে নাগরিকগণ ভিন্নমত পোষণ করেও নিরাপদে থাকবেন এবং রাষ্ট্রকে ভয় নয়, বরং আস্থার জায়গা হিসাবে দেখবেন। এমন একটি শান্তিময় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি জনাব তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপরেখায় থাকবে, সেই ইঙ্গিতই তাঁর “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণের কেন্দ্রীয় উপজীব্য বিষয়।

    দোদুল্যমানতা ও বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত ২০২৫ সাল শেষ হল দেশের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব, দেশের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, জাতির সর্বোচ্চ অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে ২০২৬ এর শুরুটা তাই কেবল বেদনা বিধুর নয়, ভয় এবং আশঙ্কারও বটে। সন্দেহ নেই, এই ভয় এবং আশঙ্কার সময়ে জনাব তারেক রহমানের “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” ভাষণটি খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে বারবার ফিরে আসবে। এ ধারণা অমূলক নয় যে, বাষট্টি বছর আগে দেয়া মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র -এর ভাষণটির মতই জনাব তারেক রহমানের “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” খ্যাত ভাষণটিও ঐতিহাসিক এবং কালোত্তীর্ণ একটি ভাষণ হিসাবে ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে।

    লেখক:- প্রফেসর ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুর
    দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়