জাতীয়

ইশরাকের পদত্যাগে মাদকবিরোধী লড়াই নিয়ে প্রশ্ন, পুলিশ-ডিএনসিকে সক্রিয় হওয়ার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। তাঁর পদত্যাগের পর রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মাদক প্রতিরোধে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদেরও আইন ও প্রশাসনিক নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় ইশরাক হোসেন মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবং সংশ্লিষ্ট থানা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যের পরপরই গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ডিএনসি।

আইন নিজের হাতে নেওয়া নিয়ে সমালোচনা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে যাওয়া সমীচীন নয়।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন না করলে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া, পুলিশের মহাপরিদর্শককে বিষয়টি জানানো কিংবা ডিএনসির কর্মকর্তাদের তলব করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেত। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সুশাসন ও আইনের শাসনের পরিপন্থি।

তাঁর মতে, ইশরাকের পদত্যাগ প্রশাসনের পাশাপাশি মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের জন্যও একটি বার্তা। তবে সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ইশরাকের বক্তব্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গেন্ডারিয়ার ওই এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে তিনি থানা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের যানবাহন ধ্বংস, জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পার হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পুলিশকে বারবার অনুরোধ করা হলেও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ওই এলাকায় ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালানোর ঘটনা এবং অতীতে পুলিশের সদস্য আহত হওয়ার কারণে সেখানে যেতে বাহিনীর অনীহা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

বিভিন্ন সংস্থার কাছে গিয়েও সমাধান না পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের চাপে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান ইশরাক। তবে তাঁর এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

শুধু বাহক গ্রেপ্তার নয়, মাদকের উৎস বন্ধের তাগিদ

মাদক নির্মূলে কেবল খুচরা পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর মতে, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থায়ন এবং এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

তিনি দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত ও মিয়ানমার থেকে আসা মাদকের প্রবেশপথ বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় বিনিয়োগ করা অবৈধ অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব জড়িত থাকার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

সামাজিক সমস্যার দিকটিও বিবেচনার পরামর্শ

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে দারিদ্র্য, বেকারত্বসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক বিষয়ও যুক্ত।

তাঁর মতে, নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতেই থাকা উচিত। স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দেখা দিলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।

ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অনভিপ্রেত এবং তা দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

ডিএনসির বক্তব্য: সীমিত সামর্থ্যেও অভিযান চলছে

ইশরাকের অভিযোগের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সংস্থাটির সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সেই সামর্থ্যের মধ্যেই কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের বিষয়ে তিনি জানান, সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ডিএনসির হাতে নেই; সেখানে অন্যান্য সংস্থা দায়িত্ব পালন করে। ডিএনসি মাদকের রুট শনাক্ত করে সেসব এলাকায় অভিযান চালায়। নতুন রুট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে মাদক প্রবেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনাটি তাই শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা, জবাবদিহি, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং জনপ্রতিনিধিদের আইনসম্মত ভূমিকা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button