ইরানে বিক্ষোভে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কী? সরকারের নীরবতায় ছড়াচ্ছে ভয়াবহ ‘প্রোপাগান্ডা’
হতাহতের তথ্য প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালের দাবিতে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক


এবিএনএ: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশটির প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিক্ষোভে প্রকৃত কতজন নিহত হয়েছেন—এ বিষয়ে ইরান সরকারের নীরবতা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সরকারিভাবে হতাহতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ধরনের দাবি ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে এবং সহিংসতা বাড়িয়ে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইরানে চলমান সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি সরকারি কর্মকর্তার বরাত দেওয়া হলেও, তার পরিচয় বা পদবি উল্লেখ না থাকায় তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একই সূত্রে খবরটি প্রচার শুরু করে। ফলে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে আলোচনা আরও তীব্র হয়।
এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ আরও চাঞ্চল্যকর দাবি তুলে ধরে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধুমাত্র ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতেই অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পোর্টালটি দাবি করেছে, নিরাপত্তা সংস্থা, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের পরিবারের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।
এর আগে মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’ এক প্রতিবেদনে জানায়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইরানি চিকিৎসক দাবি করেছেন—এক রাতেই তেহরানের ছয়টি হাসপাতালে ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান সরকার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, বিক্ষোভকারীরা ৫৩টি মসজিদ ও ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগ করেছে। তার দাবি, কোনো প্রকৃত ইরানি নাগরিক কখনও মসজিদে হামলা চালাতে পারে না।
ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেসটিভির তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ইসফাহান প্রদেশেই ৩০ জন নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন প্রাদেশিক গভর্নর আলী আহমাদি।
তিনি আরও জানান, সশস্ত্র দাঙ্গায় বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে দুই মাস বয়সী এক শিশুও নিহত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসফাহানের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি মসজিদে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া পার্শ্ববর্তী ফার্স প্রদেশে দাঙ্গায় অন্তত ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শহীদ ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা। পুলিশ স্পেশাল ইউনিট কমান্ডার জেনারেল মাসুদ মোদাক্কও জানিয়েছেন, সংঘর্ষে তার ইউনিটের আটজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সরকারি নীরবতা ও বিপরীতমুখী আন্তর্জাতিক দাবির কারণে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যযুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডার অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে।




