জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ খাত বিপর্যস্ত: গ্যাস-তেলের দামে চাপ, ঢাকাসহ দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং

Written by

in

এবিএনএ,ঢাকা: দেশের বিদ্যুৎ খাতে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি বড় শহরগুলোতেও লোডশেডিং বাড়ছে। গ্যাসের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।

বর্তমানে দেশে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগই গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় এসব কেন্দ্রের বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অলস পড়ে আছে।

কয়লা আমদানির খরচ বেড়ে চাপ

দেশে চালু থাকা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগের জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হয়। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা এলেও এর বড় অংশ আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

এর পাশাপাশি জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে, ফলে কয়লা আমদানিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে এসেছে।

তেল ও এলএনজি বাজারে অস্থিরতা

বিশ্ববাজারে ফার্নেস তেলের দামও ওঠানামা করছে। মার্চ মাসে দ্রুত বাড়ার পর বর্তমানে কিছুটা কমলেও আগের তুলনায় এখনও বেশি। একইভাবে এলএনজি বাজারেও অস্থিরতা কাটেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজির দাম বেড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে।

এই তিন জ্বালানির সম্মিলিত সংকটে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত উৎপাদন করতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরবরাহে।

গ্যাস সংকটে বন্ধ বহু কেন্দ্র

দেশে গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমিয়েছে। বেশ কিছু কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রতিদিন বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহ হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কম

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি অংশ ফার্নেস তেলের সংকটে বন্ধ রয়েছে। অনেক কেন্দ্র কম সক্ষমতায় চলছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষও এই খাতে উৎপাদন সীমিত রাখছে।

ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও কম উৎপাদন

কয়লা সংকটের কারণে বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। তবে কিছু কেন্দ্র এখনও তুলনামূলকভাবে ভালো উৎপাদন বজায় রেখেছে, যা সামগ্রিক সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।

বেড়েছে লোডশেডিং

দেশে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম থাকায় ঘাটতি মেটাতে লোডশেডিং বাড়ানো হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে।

লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে কয়েকশ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এর বড় অংশ পড়েছে ঢাকায়, এরপর চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চলে।

ভর্তুকির অপেক্ষায় বিদ্যুৎ বিভাগ

আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগ জরুরি ভর্তুকি চেয়েছে। এই অর্থ না পেলে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতামত

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। অন্যথায় বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের তুলনায় কয়লা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় সংকট মোকাবিলায় কয়লা আমদানি বাড়ানোই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো কঠিন হবে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *