ব্যাংক খাতে ধাক্কা: ১৭ ব্যাংক লোকসানে, সিএসআর ব্যয় কমে অর্ধেক!
আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ঋণ অনিয়মে চাপে ব্যাংকিং খাত—সামাজিক দায়বদ্ধতায় বড় পতন


এবিএনএ: দেশের ব্যাংকিং খাত ২০২৪ সালে এক কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। বছরের বেশিরভাগ সময় আর্থিক চাপের কারণে ১৭টি ব্যাংক লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব ব্যাংক কিছুটা মুনাফা করেছে, তাদের আয়ের পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ের ওপর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করেছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত এক দশকের হিসাব বলছে, এটি সিএসআর ব্যয়ের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে ২০১৫ সালে এ খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় হয়েছিল ৫২৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। সেই তুলনায় বর্তমান ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা খাতটির নিম্নমুখী প্রবণতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সিএসআর ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি টাকার বেশি এবং ২০২২ সালে তা ছাড়িয়েছিল ১ হাজার কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় কমেছে অর্ধ ট্রিলিয়নেরও বেশি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসায় প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র পরিষ্কার হতে শুরু করে।
বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের প্রভাব এসব ব্যাংকের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একাধিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগও নেয়।
ব্যাংকারদের মতে, সিএসআর ব্যয় কমার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুদান বা সহায়তার চাপ থাকলেও সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। ফলে এখন ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই তহবিল প্রকৃত সামাজিক উন্নয়নের পরিবর্তে অন্য খাতে ব্যয় হয়, যা মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার কথা। তবে বাস্তবে এ নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। ২০২৫ সালে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ‘অন্যান্য’ খাতে, যেখানে বরাদ্দ গেছে ৩৬ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় তুলনামূলক কম এবং পরিবেশ খাতে ব্যয় সবচেয়ে কম।
প্রতিবেদন আরও জানায়, ১১টি ব্যাংক গত বছরে সিএসআর খাতে কোনো অর্থই ব্যয় করেনি। অন্যদিকে, কিছু ব্যাংক লোকসানে থেকেও সীমিত পরিসরে সিএসআর কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, যা খাতটির বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত সংস্কার ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।




