Tag: ঋণ খেলাপি

  • সংসদে তুমুল বক্তব্য: ‘বিএনপির কোনো ব্যাংক নেই’—কারা নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক, ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রীর

    সংসদে তুমুল বক্তব্য: ‘বিএনপির কোনো ব্যাংক নেই’—কারা নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক, ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রীর

    এবিএনএ: জাতীয় সংসদে ঋণ খেলাপি ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিএনপির কোনো নিজস্ব ব্যাংক নেই, তবে দেশের মানুষ ভালো করেই জানে কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকগুলো রয়েছে।

    বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ

    অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণ খেলাপি হওয়া বা ঋণ পুনঃতফসিল কোনো নতুন বিষয় নয়। এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ব্যবসায়িক ঝুঁকি, অর্থনৈতিক সংকট বা বৈশ্বিক দুর্যোগের সময় এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

    তিনি দাবি করেন, গত প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। তার ভাষায়, “অনেক ব্যবসায়ীকে অনুমোদিত ঋণ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে, এমনকি তাদের ব্যবসা পরিচালনায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।”

    অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, যাদের এখন ঋণ খেলাপি বলা হচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন বা কারাবন্দি ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করা সহজ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

    ব্যাংকের মালিকানা প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যেসব গোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যাংক রয়েছে, তারা নিজেদের সুবিধামতো শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে পারেন। ফলে তাদের ঘনিষ্ঠদের ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। এই সুবিধা বিএনপির নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

    ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে অভিযোগ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অনেক সময় চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি পেশাদার খাতের জন্য অস্বাস্থ্যকর।

    রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে মন্তব্য

    রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-কে নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নন, বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

    তিনি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম-এর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, যারা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকেই শপথ নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়।

    অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তখন বর্তমান বিরোধী দলের নেতারা সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এখন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

    অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, “যদি কেউ সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে তাকে অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে—এটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব।”

  • ব্যাংক খাতে ধাক্কা: ১৭ ব্যাংক লোকসানে, সিএসআর ব্যয় কমে অর্ধেক!

    ব্যাংক খাতে ধাক্কা: ১৭ ব্যাংক লোকসানে, সিএসআর ব্যয় কমে অর্ধেক!

    এবিএনএ: দেশের ব্যাংকিং খাত ২০২৪ সালে এক কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। বছরের বেশিরভাগ সময় আর্থিক চাপের কারণে ১৭টি ব্যাংক লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব ব্যাংক কিছুটা মুনাফা করেছে, তাদের আয়ের পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ের ওপর।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করেছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

    গত এক দশকের হিসাব বলছে, এটি সিএসআর ব্যয়ের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে ২০১৫ সালে এ খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় হয়েছিল ৫২৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। সেই তুলনায় বর্তমান ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা খাতটির নিম্নমুখী প্রবণতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

    পূর্ববর্তী বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সিএসআর ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি টাকার বেশি এবং ২০২২ সালে তা ছাড়িয়েছিল ১ হাজার কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় কমেছে অর্ধ ট্রিলিয়নেরও বেশি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

    খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসায় প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র পরিষ্কার হতে শুরু করে।

    বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের প্রভাব এসব ব্যাংকের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একাধিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগও নেয়।

    ব্যাংকারদের মতে, সিএসআর ব্যয় কমার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুদান বা সহায়তার চাপ থাকলেও সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। ফলে এখন ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

    অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই তহবিল প্রকৃত সামাজিক উন্নয়নের পরিবর্তে অন্য খাতে ব্যয় হয়, যা মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

    নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার কথা। তবে বাস্তবে এ নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। ২০২৫ সালে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ‘অন্যান্য’ খাতে, যেখানে বরাদ্দ গেছে ৩৬ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় তুলনামূলক কম এবং পরিবেশ খাতে ব্যয় সবচেয়ে কম।

    প্রতিবেদন আরও জানায়, ১১টি ব্যাংক গত বছরে সিএসআর খাতে কোনো অর্থই ব্যয় করেনি। অন্যদিকে, কিছু ব্যাংক লোকসানে থেকেও সীমিত পরিসরে সিএসআর কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, যা খাতটির বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরে।

    সব মিলিয়ে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত সংস্কার ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।

  • ঋণের সংকটে বেসরকারি খাত, দুই দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম

    ঋণের সংকটে বেসরকারি খাত, দুই দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম

    এবিএনএ: বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশে। এটি গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

    অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুদের উচ্চ হার, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ঋণ খেলাপির হার বৃদ্ধির কারণে এই প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ৩১ জুলাই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে, যেখানে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়ার পরিকল্পনা থাকবে।

    ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর থেকে ঋণের প্রবাহে স্থবিরতা দেখা দেয়। বেসরকারি খাতের অনেক ঋণগ্রহীতা গ্রেফতার বা বিদেশে পলায়ন করায় নতুন ঋণ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি পূর্বের অনেক ঋণও এখন খেলাপি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা এক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে।

    এর পাশাপাশি ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে গড় সুদহার ছিল ৯-১০ শতাংশ, তা এখন ১৩-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে আমানতের গড় সুদহারও বেড়ে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে।

    বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ডিসেম্বরে ৭.২৮ শতাংশে ছিল, জানুয়ারিতে কমে ৭.১৫ শতাংশে আসে, ফেব্রুয়ারিতে আরও কমে দাঁড়ায় ৬.৮২ শতাংশ। এরপরও মে মাসে তা সামান্য বেড়ে ৭.১৭ শতাংশ হয়েছিল। অথচ করোনার সময়েও এই প্রবৃদ্ধি কখনো সাড়ে সাত শতাংশের নিচে নামেনি।

    একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। জুনে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে এসেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

    অন্যদিকে সরকার নিজেও ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম ঋণ নিচ্ছে। গত অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা, যা আগের চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা কম।

    এছাড়াও সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া আগের দায় পরিশোধে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে এবং ৬৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে, যার ফলে বাজারে তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

    সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগের অনাগ্রহ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্যের ঘাটতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে ঋণের গতি স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো— বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে আবার ঋণ প্রবাহ সচল করা।