মন্দ-বিশ্বাস নাকি আত্মপ্রবঞ্চনা

ড. মো. শওকত হোসেন: আমাদের সমাজে অনেক মানুষই আছেন যারা কোনো মন্দ কিছু, অকল্যাণকর কিছু বা অনাকাঙ্খিত কোনো ঘটনা ঘটলে বিভিন্নভাবে তার দায় এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তারা অনেকেই এই বিষয়ে অন্যের দোষ বা দায় খোঁজার চেষ্টা করেন। সন্তান পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে অন্যের সন্তানের সাথে মিশে পড়ালেখায় ফাকি দিতে শিখেছে— এমন কথা অনেক অভিভাবক বলে থাকেন। কারো জীবনে ভালো চাকরি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি না আসলে বিভিন্ন অজুহাত তোলেন। এমনকি জীবনের সকল ব্যর্থতার দায় বিশ্ব স্রষ্টার ওপরও চাপিয়ে দিতে দেখা যায়। কেননা অনেকেই “ভাগ্যে নেই”, “কপাল মন্দ”— এ ধরনের কথা বলে থাকেন। এতো গেলো নিজের সম্পর্কিত বিষয়। অন্য কোনো বিষয় যেমন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোনো অনাচার, অবিচার যাই হোক না কেন আমরা এমন কথা অনেক সময় বলি যে, “আমি কি করবো আমার তো ক্ষমতা নেই।” আছে। যেমন আপনি প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করতে পারতেন, প্রতিবাদ করতে পারতেন, এসব কিছুই না করতে পারলে অন্তত জনমত তৈরি করতে পারতেন, বা ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা করতে পারতেন।
আমরা এমন দায় এড়ানোর কাজ, আত্মবিশ্বাসহীনতার কাজ মূলত অজ্ঞতা থেকে অথবা অলসতার জন্যই প্রধানত করে থাকি। আমরা ভাবি, এসব আমাকে দিয়ে হবে না। আমি কি আর এমন ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি। আমরা নিজের মনেই এমন একটি নেতিবাচক বা ধ্বংসাত্মক বিশ্বাস পুষে রাখি যা আমাদের অলস, অসচেতন, দায়িত্বহীন, প্রগতি বিমূখ এবং আত্মবিশ্বাসহীন করে তোলে। এই অবস্থাকেই দার্শনিক জ্যাঁ. পল. সার্ত ফরাসী ভাষায় Mauvaise foi বলেছেন; যাকে ইংরেজিতে Bad Faith বলে অনুবাদ করা হয়। আক্ষরিকভাবে বাংলায় আমরা একে মন্দ-বিশ্বাস বলতে পারি, তাছাড়া আত্ম প্রচঞ্চনাও বলা চলে। একটি মাত্র শব্দে বাংলায় একে বলা মুশকিল; কেননা উপরে বর্ণিত যেসকল অবস্থা তার সবকিছুরই সমন্বয় বা প্রত্যেকটিকেই Bad Faith বলা চলে। সার্ত যে অর্থে টার্মটিকে ব্যবহার করেছেন তাতে করে বলা যায়, মন্দ বিশ্বাস হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তিমানুষ তার নিজের প্রকৃত স্বাধীন সত্তা ও সম্ভাবনাসমূহ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন না হয়ে নিজেকে কোনো বিশেষ সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, এবং নিজের অবস্থার জন্য অন্যকিছুর ওপর দায় চাপিয়ে নিজের দায়িত্বশীল অবস্থাকে আড়াল করে ফেলে। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক্।
মন্দ বিশ্বাস হলো প্রকৃত স্বাধীনতাকে অস্বীকার: সার্তের মতে, মানুষ স্বাধীন। স্বাধীনতা জীবিত মানুষের এক আবশ্যিক বাস্তবতা। মানুষ হওয়া আর স্বাধীন হওয়া এক কথা। মানুষ স্বাধীন না হয়ে পারে না। সার্তের ভাষায়, “আমি স্বাধীনতার দণ্ডিত”, ÒI am condemned to be free.Ó (Being and Nothngness, p. 439) মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে। কোনো কিছু মেনে নিতে পারে। কোনো কিছু বর্জন করতে পারে। ইচ্ছা অনুসারে দৈনন্দিন কর্ম নির্বাচন করে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার নানা রকম প্রচেষ্টা মানুষ চালাতে পারে। এটা সত্য যে, মানুষ চাইলেই সব করতে পারেনা। কিন্তু করার চেষ্টা করা এবং নির্বাচন বা বাছাই করার বিষয়টিতে মানুষ একেবারেই স্বাধীন। এই স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে কেউ যদি মনে করে আমি আমার এই অবস্থাকে আর পরিবর্তন করতে পারবো না, আমার জন্য এটাই নির্ধারিত, তাহলে সেই লোক নিজের অবাধ নির্বাচনমূলক স্বাধীনতা, নিজেকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলার স্বাধীনতাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করে এক অন্ধ বিশ্বাসের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলো। আর এই অন্ধ বিশ্বাস হলো এক প্রকার মন্দ বিশ্বাস (bad faith)।
সার্ত মনে করেন, মানুষের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। একই মানুষ আত্মবিকাশের প্রচেষ্টার মাধ্যমে নানারকমভাবে নিজের সত্তাকে গড়ে তুলতে পারে। কেননা মানুষ হচ্ছে, তাঁর ভাষায়, নিজের জন্য সত্তা বা স্ব-নির্মিত সত্তা বা being for-itself (Etre-pour-soi)| এই সত্তা এক অপূর্ণ সত্তা, তবে ব্যাপক সম্ভাবনাময়। বৈচিত্র্যময় সম্ভাবনা থাকে বলেই তার বর্তমান অবস্থা অপূর্ণ থাকে। এই স্বয়ং অপূর্ণ সত্তাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব ব্যক্তিগত। অর্থাৎ একজন ব্যক্তিমানুষ স্বাধীনভাবে নিজেকে নির্মাণ করবে। বাস্তবে কি হবে না হবে, সেটা অন্য বিষয়— নিজে ইচ্ছানুযায়ী হয়ে ওঠার জন্য সচেতনভাবে সচেষ্ট থাকবে। সার্ত বলেন:
ÒMan is free because he is not himself but presence to himself. The being which is what it is can not be free. Freedom is precisely the nothingness which is made-to-be at the heart of man and which forces human-reality to make itself instead of to be.”[440]
সার্ত অন্য আর এক ধরনের সত্তার কথা বলেছেন, তা হলো স্বরূপত সত্তা বা নির্মিত সত্তা, ফরাসী-ভাষায় (Etre-en-soi), ইংরেজিতে যাকে বলা হয়ে থাকে being-in-itself. এই সত্তা রেডিমেইড, নিজের থেকে পরিবর্তিত হওয়ার স্বাধীনতাহীন। এটা যা আছে তাই। এই অর্থে এর কোনো হয়ে ওঠার তাগিদ নেই, কেননা সেই সম্ভাবনাও নেই। জড়বস্তু হলো এই ধরনের সত্তা। এটা যা এটা তা ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু মানুষ চিন্তা ও সিদ্ধান্তে অবাধ স্বাধীনতার অধিকারী। তাই মানুষের শূন্যতা স্বাভাবিক বাস্তবতা। মানুষ যদি সচেতন হয়, তাহলে সে অনেক অপূর্ণতাই লক্ষ করবে নিজের মধ্যে। কেননা তার অনেক সম্ভাবনা আছে। সেই অনুযায়ী স্বাধীনভাবে উদ্যোগ নিয়ে তার জীবনের যে কোনো অবস্থা বা জীবনের গতি পরিবর্তন করার দায়ও প্রত্যেক মানুষেরই আছে। মানুষ যখন এই দায় বুঝেও এমন বিশ্বাস নিয়ে সচল থাকতে চায় যে, তার কিছুই করার ছিলো না, ঘটনা সবই ঘটে গেছে, এটা এরকমই— ভাগ্যে ছিলো, তাহলে যে অবস্থায় সে নিজেকে আটকে ফেলেছে, যে বিশ্বাস দ্বারা সে মগ্ন আছে— এটাই হলো bad faith বা মন্দ-বিশ্বাস।
মন্দ-বিশ্বাস এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা বা নিজের সাথে নিজের প্রতারণা করা। অন্যে যদি আপনার সাথে প্রতারণা করে, তাহলে ঐ প্রতারক মিথ্যাবাদী, ছলনাকারী; কিন্তু আপনার সত্যটি জানা থাকে না, তাই আপনি প্রতারিত হন। কিন্তু মন্দ-বিশ্বাস হচ্ছে এমন একটি প্রতারিত হওয়ার অবস্থা যেখানে আপনি আপনার নিকট সত্য গোপন করেন বা সত্যটিকে গ্রহণ না করে একটি মিথ্যা বুঝ দিয়ে নিজেকে কর্তব্য. দায়িত্ব, প্রতিরোধ, এবং পরিবর্তনের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে নিজেই নিজের সাথে প্রতারণা করছেন। তাই মন্দ-বিশ্বাসের সময় প্রতারিত ব্যক্তি এবং প্রতারক অভিন্ন। মানুষ দায় নিতে অস্বস্তিবোধ করে। তাই সে অপ্রীতিকর কিছু সত্যকে, নিজের অবজ্ঞা ও দুর্বলতাকে ঢেকে রাখার জন্য নিজের মনকে স্বস্তিকর মিথ্যে বুঝ দিতে চায়। ফলে তার আত্মপ্রতারণার শিকার হতে হয়। সার্ত বলেন:
“এটা সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, যে ব্যক্তি মন্দ-বিশ্বাস (bad faith) চর্চা করে, সে হয় একটি অপ্রিয় সত্যকে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে, অথবা একটি প্রীতিকর অসত্যকে সত্য বলে উপস্থান করে। এদিক থেকে মন্দ-বিশ্বাসকে গঠনগতভাবে মিথ্যার মতোই মনে হয়। তবে একটি মূল বাস্তবতা হলো (যা সাধারণ মিথ্যার সাথে পৃথক) এই যে, মন্দ-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আমি নিজেই সত্যকে লুকাই নিজের কাছ থেকে। এর ফলে এই অবস্থায় প্রতারক (deceiver) এবং প্রতারিত (deceived) ব্যক্তির মধ্যে যে দ্বৈততা (duality) [সাধারণ মিথ্যার ক্ষেত্রে যা থাকে] সেটা উপস্থিত থাকে না। বরং মন্দ-বিশ্বাস প্রকৃতিগতভাবে এটা অনুমিত করে যে, এটি একটি একক চেতনার ঐক্যের মধ্যেই সংঘটিত হয়।”
(To be sure, the one who practices bad faith is hiding a displeasing truth or presenting as truth pleasing untruth. Bad faith then has in appearance the structrue of falsehood. Only what changes everything is the fact that in bad faith it is from myself that I am hiding the truth. Thus the duality of the deceiver and the deceived does not exist here. Bad baith on the contrary implies in essence the unity of a single consciousness.) [p.49]
সার্তের এই মন্দ-বিশ্বাসের অবস্থা দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে লক্ষ করা যায়। এমন কিছু ঘটনার উদাহরণ সার্ত তাঁর Being and Nothingness গ্রন্থে দিখেছেন। এর একটিকে আমরা “প্রথম অভিসারে যাওয়া এক নারী” (The woman on the first date) শিরোনামে তুলে ধরতে পারি। সার্ত দেখিয়েছেন যে, একজন নারী প্রথম কোনো এক লোকের সাথে অভিসারে গিয়েছে। সেই পুরুষটি সম্পর্কে সে জানে যে, (ক) লোকটি একটু বেশি রোমান্টিক, (খ) তার যৌন লিপ্সাও থাকতে পারে। এই দু’টি ঘটনা জেনেও মহিলা তার সাথে অভিসারে যেতে রাজি হলো। অভিসারে গিয়ে আরও কিছু ঘটনা ঘটলো: ১. পুরুষটি তাকে বললো, “তুমি ভীষণ আকর্ষণীয়” (You are so attractive. p.55) ২. এরপর সে তার হাত ধরলো। মহিলা এই দু’টি ঘটনার কোনোটিতেই কোনো আপত্তি করলো না। ঘটনা ঘটে যেতে দিলো। কিন্তু মনে মনে মহিলা বেশ সতী। সে এই অবস্থা মোটেই চায় না। কিন্তু দায় নেয় না। আরও কিছু আপত্তিকর বা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলেও সে যদি বলে: ‘আমার কিছু করার ছিলো না, লোকটি ভীষণ মন্দ। আমি চাইনি এমন ঘটনা ঘটুক। কিন্তু আমার উপর এটা ঘটে গেছে। এজন্য আমি মোটেই দায়ী না।’ এ ধরনের চিন্তা বা কথা ঐ মহিলা নিজের কাছেই নিজে বলছে। এসব বলে সে নিজেকে ভালো ভেবে এক ধরনের দায় এড়ানোর আত্মতুষ্টি নিচ্ছে। কিন্তু সার্ত এই ঘটনাটিকে আত্মপ্রচঞ্চনা বা নিজের সাথে নিজের করা প্রতারণা হিসেবে বর্ণনা করেন। কেননা ঐ মহিলা নিজের স্বাধীনতা ব্যবহার করে যে কাজগুলো করতে পারতো, তা হলো:
১. মহিলাটি অভিসারে যেতে রাজি না হতে পারতো। অভিসারে কী হয় তা সে জানে। তাছাড়া ঐ ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কেও তার সন্দেহ ছিলো। তাই প্রস্তাব পর্যায়ে সে না করে দিতে পারতো।
২. পুরুষটি যখন তার সৌন্দর্যের (আসলে শরীরের) যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশংসা করেছে, তখন সে প্রতিবাদ করতে পারতো। এ ধরনের কথা তার পছন্দ নয়, এমনটি অন্তত বলতে পারতো।
৩. লোকটি যখন মহিলার হাত স্পর্শ করেছে সেই সময় সে বাধা দিতে পারতো।
মহিলা এসব কোনোটি না করেও যদি নিজের কাছে নিজে দায়মুক্ত থাকতে চায়, এবং নিজেকে এমন বুঝের মধ্যে রাখে যে, তার কিছুই করার ছিলো না, সব দোষ ঐ মন্দ লোকটির, তাহলে এটা এক ধরনের মন্দ-বিশ্বাস। এটি একটি আত্মপ্রবঞ্চনা। নিজের প্রতি নিজের প্রতারণা। কেননা নিজেকে অসত্য কথা বুঝিয়ে মহিলা দায় এড়াতে চাচ্ছে, অথচ নিজে সত্যটি জানে। নিজের কাছেই নিজে যখন এমন অসত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তখন তা সার্তের ভাষায় আত্মপ্রতারণা। এখানে প্রতারক ও প্রতারিত ব্যক্তি একজনই। নিজেই নিজের সাথে প্রতারণা করছে।
সার্ত যে সমাজ কাঠামো বা সংস্কৃতিতে date বা অভিসারের কথা বলছেন তা বেশ উদার প্রকৃতির। সেখানে নানা রকম ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই ঐ মহিরার ঐসব দায়-দায়িত্ব নিয়েই পুরুষটির সাথে হঠাৎ করে ‘ডেট’-এ যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে। এ পর্যায়ে আমরা বাঙালী সমাজে ‘অভিসার’ বলতে কেমন ঘটনাকে বুঝে থাকি তারই একটি বর্ণনা দিতে চাই। কোনো বাস্তব ঘটনার উদারহণ না দিয়ে (নিরাপদে) সাহিত্য থেকে উদারহণ দিচ্ছি। সাহিত্য মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। দেখা যাক আমাদের চিরায়ত সংগীতসমূহে ‘অভিসার’কে কীভাবে দেখা হয়েছে। ৯০-এর দশকের (১৯৯০) একটি জনপ্রিয় (পুরুষ কণ্ঠের) গান:
“মেঘে ঢাকো মুখ ও চাঁদ মেঘেতে লুকাও
অভিসারে আসবে প্রিয়া যাওনা সরে যাও।
নিন্দুকের ঐ চোখ বাঁচিয়ে আসবে লুকিয়ে
তোমার আলোয় যায়গো দেখা আছি সেই ভয়ে।”
[শিল্পী: রবী চৌধুরী]দেখুন অবস্থা! মেঘের মধ্যে চাঁদকে লুকিয়ে যেতে বলছে প্রেমিক। কেননা চাঁদের আলোতে গোপনে অভিসারে আসা তার প্রেমিকাকে কেউ যেন দেখতে না পারে। এমন অন্ধকার রাতে অভিসারে যদি কোনো নারী বের হয়, তাহলে কিছুটা দায়িত্ব নিজেও নিতে হবে। আর তা না হলে সময়মত আপত্তি জানাতে হবে। কিন্তু “সাধও করে মনও পোড়ে”— এমন মুডে থেকেও নিজের মনের সত্য বা বাস্তবতাকে মিথ্যা প্রচঞ্চনার পানি দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করা হবে নিজের সাথে প্রতারণার নামান্তর। এটাই bad faith বা মন্দ-বিশ্বাস।
এবারে নারী কণ্ঠের একটি লোকগীতি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। গানটি যদিও বৈষ্ণব পদাবলীর একটি ভক্তিমূলক গান, এর একটি প্রতীকী অর্থ আছে, দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে, আছে ধর্মীয় বিশ্বাসও। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাঙালী সমাজে একশ্রেণির মানুষ এই গানটিকে মানব-মনবীর রোমান্টিক প্রেমের অভিসারমূলক অবস্থা বলেই ভাবতে পছন্দ করে। গানটি হচ্ছে:
“শ্যাম রে তোমার সনে,
একেলা পাইয়াছিরে শ্যাম, এই নিঠুর বনে,
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম।
একেলা পাইয়াছি হেথা, পালাইয়া যাবে কোথা?
চৌদিকে ঘিরিয়া রাখবো, সব সখি গনে।
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম।”
এবারের অবস্থায় নারী মূলত অভিসারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু শ্যামের বা প্রেমিক পুরুষটির কি কিছুই করার বা বলার নেই? যদি না থাকে তবে দায় তারও নিতে হবে। আর এই দায় না নিয়ে কেবল ঐ নারী বা তার সখিগণের ওপরই যদি দোষ চাপিয়ে নিজের প্রতিবাদের প্রচেষ্টা না করার সত্যকে চেপে নিজের কাছেই মিথ্যা বুঝ দিতে যাওয়া হবে এক ধরনের আত্ম-প্রতারণা। এটাই মন্দ-বিশ্বাস।
এবার অন্যরকম আর একটি উদারহণ, ক্যারিয়ার বিষয়ক। সার্ত তাঁর Being and Nothingness– এ একজন ওয়েটার বয়ের উদাহরণ দিয়েছেন। কাজ করে ভালো। তবে এই চাকরিতে সে সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু তেমন কিছুর উদ্যোগও সে নিতে যায় না। কেননা সে ভাবে, এর থেকে অন্য কিছু সে হতে পারবে না। অন্যকিছু হওয়ার ভাগ্য তার নেই। তাকে এই কাজের জন্যই নিবেদিত থাকতে হবে, এটিই নিয়তি। এখন দেখুন, সে অন্য কোনো কিছুর জন্য চেষ্টাও করবে না, আবার দোষ বা দায় চাপাবে ভাগ্যের ওপর। যেন সে নিয়তির লিখন সবই জানে। আসল বিষয় হচ্ছে সে নিজেও জানে, অন্য কিছুর জন্য সে পর্যাপ্তভাবে চেষ্টা করছে না। এই অপ্রীয় সত্যটি সে গোপন রাখতে চায়। কেবল অন্যের নিকটই নয়, নিজের কাছেও। নিজের মনকে সে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, এটা তার নিয়তি। তার এ কাজ না করে উপায় নেই। তাই অন্য কিছুর চেষ্টা করে লাভ কি? এধরনের মিথ্যা বুঝ মানতে তার ভালো লাগে, কেননা তাতে নিজেকে সে দায়মুক্ত রাখতে পারে। ওয়েটারের অবস্থা হলো ক্যারিয়ার সংক্রান্ত একটি মন্দ-বিশ্বাসের যথার্থ উদাহরণ।
সার্তের দেখানো The woman on the first date Ges The weater boy in a Caffay এই দু’টি উদারহরণের মতো আমাদের বাস্তব জীবনে, চারিপাশের মানুষের মধ্যে, এমনকি আমি, আপনি সবাই কম-বেশি bad faith বা মন্দ-বিশ্বাসের ধারক। আমরা আমাদের অনেক সুখকর মিথ্যা আত্ম-প্রবোধ নিজের মধ্যে পুষে রাখি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ ব্যাপারে সচেতন নই। আমাদের অবচেতন অথবা অচেতন মনে রয়ে যায় নানা রকম মন্দ-বিশ্বাস। এমনকি আমরা দৈনন্দিন আলাপ-চারিতায় মাঝে মাঝে এমন মন্দ-বিশ্বাস প্রকাশ করেও বসি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ভাগ্যের দোহাই দেইনি এমন লোক আমরা নেই বললেই চলে। অনেক বিপদ ও বিরূপ অবস্থা আসলেই আমরা কারো না কারো ওপর দায় চাপিয়ে, এমনকি পরিস্থিতির দোষ দিয়ে নিজকে দায়মুক্ত রাখতে চেষ্টা করি। অনেক সামাজিক দায়ও এড়িয়ে যেতে চাই। সংসারে অভাব আছে, কিন্তু আয় বাড়ানোর পর্যাপ্ত চেষ্টা না করে, অন্য অনেক কিছুর দোষ দেই। সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে, দায় নেই না। অথবা এরকম গান শুনি “চেয়ে চেয়ে দেখলাম, তুমি চলে গেলে/ আমার বলার কিছু ছিলো না।” আমরা আমাদের ব্যর্থতা ঢাকতে দুনিয়ার নানারকম ব্যর্থ বা ট্রাজিক কাহিনী ভালোবাসি। কিন্তু পর্যাপ্ত চেষ্টা করে, সংগ্রাম করে, সৌভাগ্যকে অর্জন করার মানসিকতা দেখাই না। এসবই মন্দ-বিশ্বাসের ফল।
এখন কথা হলো, মন্দ-বিশ্বাস থেকে মুক্ত হবার উপায় কী? সার্তের মতে, এর জন্য মানুষকে অস্তিত্বের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হবে। মানুষ যে নিজের জন্য নির্মিত সত্তা (being-for-itself) এটা তাকে বুঝতে হবে। মানুষের মধ্যে অবারিত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, এটা প্রত্যেককে নিজের মতো করে বুঝতে হবে। মানুষের প্রকৃত অস্তিত্বের রহস্য তার আত্ম-সচেতনা ও আত্ম-অতিক্রমের মানসিকতার মধ্যে রয়েছে— এটা ভালো করে মানতে হবে। সার্তের অস্তিত্ববাদী চিন্তার মূল সূত্র হলো, “অস্তিত্ব সারসত্তার পূর্বগামী” (existence precedes essence)। মানুষ স্বাধীনভাবে আত্ম-সচেতন হয়ে নিজেকে পাল্টানোর চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত তার সত্তার নতুন নতুন দিক যোগ করতে পারে। আর সত্তা বা “প্রকৃত ব্যক্তি” কোনো দিনই চূড়ান্ত হবে না। মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ এমন ইতিবাচক বদলানোর চেষ্টা করলে সে প্রকৃত অর্থে মন্দ-বিশ্বাসমুক্ত হয়ে নিজের অস্তিত্বকে যথাসম্ভব অর্থবহ করে তুলতে পারবে বলে সার্ত মনে করেন।
মন্দ-বিশ্বাসের কবলে মাঝে মধ্যে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার বোধ, আত্ম-নির্মাণের তাগিদ থেকে জীবনকে অর্থবহ করার দায়িত্ববোধ যখনই আসে— তখনই মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। মানুষ তার জীবনের যেকোনো অবস্থা থেকে নিজেকে নতুন করে বিনির্মাণের কাজ শুরু করতে পারে। সার্ত তাঁর বিভিন্ন লেখায়, বিশেষকরে বেশ কিছু সাহিত্যকর্মে এই দিকটি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। যেমন তাঁর Nausea উপন্যাসে দেখিয়েছেন, নায়ক রোক্যাঁতাঁ (Antoine Roquentin) জীবনের এক পর্যায়ে এসে ভীষণ হতাশায় নিমজ্জিত হয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, তার জীবনের কোনো অর্থ নেই। একটি গাছের শেকড়ের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে শুরু করে যে, এই গাছ, চারিপাশের বস্তু-জগত পাথর এবং মানুষ সবকিছুই কেবল টিকে আছে, কিন্তু এর কোনো স্বকীয় অর্থ বা তাৎপর্য নেই, নেই কোনো পূর্বনির্ধারিত সারসত্তা বা নির্মিত রূপ (essence)। চারিদিকে কেবল নিদারুন আকস্মিকতা (contingent), সবই অ্যাবসার্ড, যেকোনো মুহূর্তে বস্তুজগতও যেমন ধ্বংস ও অনাকাঙ্খিত অবস্থার শিকার হতে পারে, মানুষের জীবনেও এটা সত্য। মানুষ হিসেবে তার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি তথাকাথিত নির্ধারিত সম্মান, মর্যাদা, সুখ-শান্তি, নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই। এক সময় তিনি ইতিহাসের গবেষক হিসেবে ইতিহাসের কোনো পর্বে মানুষের সার্থকতা খুঁজছিলেন, পুরোনো প্রেমিকা যে তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে, তার স্মৃতি রোমান্থন করছিলেন। তিনি ভাবতেন এই সব কাজের মধ্যে তিনি বন্দি হয়ে গেছেন। তার বোধহয় এসব থেকে বের হবার উপায় নেই। তিনি ঐসবের মধ্যে আটকা আছেন, কিন্তু এগুলোকেও শান্তি, অগ্রসরমানতা, এমনকি অর্থপূর্ণতার বাহক মনে করছেন না। এমনতাবস্থায় তার জীবনকে ভীষণ ব্যর্থ, অর্থহীন এবং বোঝা মনে হচ্ছিলো, নিজের জীবন যেন সহ্য হচ্ছিলো না তার। এক চরম অসস্থির ভাব তার নিজের জীবন নিয়েই। এই অবস্থা যেন ভীষণ এক বমি বমি ভাব। বমি হচ্ছে না, আবার ভেতরে ঐ অসস্থি আটকেও রাখতে পারছে না। এই বমি-বমি ভাব বা nausea অবস্থায় যখন সে চরমভাবে নিপতিত, এমতাবস্থায় সে একদিন একটি জ্যাজ গান শোনে। গানটির শিল্পগুণ এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা তাকে নতুন এক বার্তা দেয়। সে লক্ষ করলো যে, গানটির গীতিকার ও সুরকার একজন ইহুদি, তবে তিনি এটি তৈরি করেছেন নিউইয়র্কে বসে। অন্যদিকে এর গায়ক একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান নারী। জাতিগত ক্ষমতা ও আবাসভূমির বিচারে অবহেলিত দু’জন মানুষের শিল্প প্রচেষ্টা কীভাবে বিশ্বময় মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে, তারা কীভাবে সাধারণ মানুষ এমনকি পিছনে পড়া, মর্যাদাহীন মানুষ থেকে নিজেদের দক্ষতা ও কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে জীবনের অর্থ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিনিয়ে নিতে পারে— তা সে দার্শনিক গুরুত্বের সাথে অবলোকন করে। তার গভীর এক দার্শনিক উপলব্ধি হয়। তা হলো: “জীবনের কোনো সুনির্ধারিত অর্থ থাকে না। মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে শ্রম ও সাধনার মাধ্যমে সেই অর্থ ও মূল্যায়ন তৈরি করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হয়।” রোক্যাঁতাঁ সিদ্ধান্ত নিলো যে, সে এমন কোনো শিল্পকর্ম করবে। ঠিক করলো তার তো লেখালেখির কিছু দক্ষতা ছিলো, এটাকে সে নতুনভাবে কাজে লাগাবে। সে তখন সিদ্ধান্ত নিলো উপন্যাস লিখবে। নির্মিত ইতিহাস, পুরোনো প্রেমের কাসুন্দি না ঘেটে নতুন করে— সৃষ্টি করবে কিছু একটা। সে তার স্বাধীনতা ও দক্ষতাকে ব্যবহার করবে। এভাবে সে ঢুকে গেলো শিল্পকর্মে, জীবনকে মন্দ-বিশ্বাস মুক্ত করে অর্থবহ করে তুললো। এমনকি ঐ উপন্যাস লেখার কাজটির শুরু থেকেই সে দেখলো তার বমি বমি ভাব কেটে গেছে। জীবন সম্পর্কে সে উদ্যমী ও সাহসী হয়ে উঠছে। জীবনের দায় এখন সে কোনো অশুভ বাস্তবতার উপর না চাপিয়ে নিজের উপরই নিয়ে নিচ্ছে। নিজেকে ভীষণ স্বাধীন ও কর্তা সত্তামূলক অবস্থায় মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে নিজের জীবন তরীর মাঝি সে নিজেই। তার জীবনের যত রকম দায়-দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়িয়ে নিজেকে প্রবঞ্চনার মধ্যে না রেখে কাজের মধ্য দিয়ে সার্থকতা খুঁজতে হবে। এমনকি সফলতা ব্যর্থতাও কোনো বিষয় নয়, নিজে কাজ করা, প্রচেষ্টায় ত্রুটি না করার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সার্থকতা। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছেন:
“আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ,
খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত।”
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

