
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় এক সন্ধ্যায় একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত সাত থেকে নয়টি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া মালিবাগে সিআইডি ও এসবির প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণ, পল্লবী থানা এবং মিরপুরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ভাটারায় একটি স্কুলবাসেও আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
রোববার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ঢাবি ক্যাম্পাসে একের পর এক বিস্ফোরণ, আটক ৩
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের টিএসসি, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন, প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন এলাকা, ভিসি চত্বর, নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে সিনেট ভবনের সামনে প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর কিছুক্ষণ পর টিএসসি এলাকায় পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পরে প্রশাসনিক ভবনের পাশ, ভিসি চত্বর এবং নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণসংলগ্ন এলাকায়ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
এ ছাড়া জগন্নাথ হলের কাছাকাছি, শাহবাগ ও বাংলা একাডেমি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথাও জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পুলিশ জানায়, সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে টিএসসি-সংলগ্ন মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে তিনজনকে আটক করা হয়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা তাদের আটক করতে ভূমিকা রাখেন। পরে পুলিশ তাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন রেজাউল করিম (৪২), সোহেল রানা (৩৩) ও নাজমুস সাদ (৩৩)। তাদের মধ্যে রেজাউল করিমের বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুরে, সোহেল রানার রাজশাহীর পুঠিয়ায় এবং নাজমুস সাদের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়।
বিস্ফোরণের পর কয়েকজনকে পালিয়ে যেতে দেখে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তাদের আটকানোর চেষ্টা করেন। এ সময় আটক ব্যক্তিদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, ক্যাম্পাসে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। প্রক্টরিয়াল টিম ও শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে তাদের আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
তিনি জানান, বিভিন্ন স্থানে সাত থেকে নয়টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
প্রক্টর আরও বলেন, ক্যাম্পাসে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
মালিবাগে সিআইডি-এসবি কার্যালয়ের পার্কিংয়ে ককটেল
একই সন্ধ্যায় রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণের পার্কিং এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
রাত সাড়ে ৭টার দিকে এ বিস্ফোরণ হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, দুর্বৃত্তদের নিক্ষেপ করা ককটেলটি কার্যালয়ের ভেতরে পার্কিং করে রাখা একটি গাড়ির বনেটের ওপর পড়ে বিস্ফোরিত হয়। তবে এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিআইডি ও এসবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
পল্লবী থানায় ককটেল নিক্ষেপ, আহত এসআরবি সদস্য
রাজধানীর পল্লবী থানা প্রাঙ্গণেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) একজন সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন।
রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোটরসাইকেলে আসা দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি পাশের ফ্লাইওভারের ওপর থেকে থানার ভেতরে ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার একটি ভিডিওতে দুই ব্যক্তিকে মোটরসাইকেলে এসে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যেতে দেখা যায়।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই দুর্বৃত্তরা থানায় ককটেল নিক্ষেপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
মিরপুরে প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ
রাত ৮টা ৩৫ মিনিটের দিকে মিরপুর-১ নম্বরের সনি হলের সামনে একটি প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। মোটরসাইকেলে এসে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা এ ঘটনা ঘটায় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সনি হলের সামনে একটি প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপের পর বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ভাটারায় দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলবাসে আগুন
এদিকে রাজধানীর ভাটারায় ১০০ ফিট সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি স্কুলবাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
বাড্ডা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে অনন্ত টাওয়ারের সামনে বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়। এতে কেউ হতাহত হয়নি।
ঘটনার একটি ভিডিওতে হলুদ রঙের বাসটিকে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখা যায়। বাসটি তখন রাস্তার পাশে দাঁড় করানো ছিল।
নাশকতার ঘটনা তদন্তে ডিএমপি, বাড়ানো হয়েছে নজরদারি
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন জানান, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার প্রতিটি ঘটনা পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন ও অঙ্গসংগঠনের সদস্যও রয়েছেন বলে জানান তিনি।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের অভিযান ও মোতায়েন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল পার্টি ও পিকেট ডিউটির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ককটেল তৈরির উপাদান কোথায় প্রস্তুত করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগেও বিস্ফোরকদ্রব্য ও ককটেল তৈরির উপাদানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। নাশকতার উদ্দেশ্যে পেট্রোল পাম্প বা অন্য কোনো স্থান থেকে দাহ্য পদার্থ কেনাবেচা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারা নাশকতার উদ্দেশ্যে দাহ্য পদার্থ সংগ্রহ করছে, তাদের শনাক্তে ডিএমপির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
একই সন্ধ্যায় রাজধানীর একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের এসব ঘটনার তদন্ত চলছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।




