এবিএনএ,বাগেরহাট : দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে শুরু হলো বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। আজ (১ এপ্রিল) ভোর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এই কার্যক্রম, যা চলবে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত।
বন বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মোট ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টাল মধু এবং ৩০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে নির্ধারিত হয়েছে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা।
এবার আগাম বৃষ্টির কারণে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে খলিসা, গরান, পশুর ও হারগোজাসহ বিভিন্ন গাছে ব্যাপক ফুল ফুটেছে। ফলে ওইসব এলাকায় মৌমাছির উপস্থিতি বেড়েছে এবং মধু উৎপাদনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। তবে পূর্বাঞ্চলের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে তুলনামূলক কম বৃষ্টি এবং কম গাছপালা থাকার কারণে সেখানে মৌসুমের শুরুতেই পর্যাপ্ত মধু পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য ওই অঞ্চলের মৌয়ালরা কয়েকদিন পর থেকে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করবেন।

মৌসুম শুরুর আগেই মৌয়ালরা নৌকা মেরামত এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করে রেখেছেন। দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করে তারা প্রথমে খলিসা, গরান ও পশুর গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। পরে পর্যায়ক্রমে কেওড়া ও ছইলা ফুলের মধু আহরণ করা হবে।
গত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের দুই রেঞ্জ থেকে প্রায় ৬৫০ কুইন্টাল মধু ও ২০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়েছিল। মৌয়ালদের মতে, বন বিভাগের অনুমতি, রাজস্ব ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিজনের প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবে মধু বিক্রি করে তারা উল্লেখযোগ্য লাভ করতে সক্ষম হন।
শরণখোলার মৌয়ালরা জানান, গত মৌসুমে তাদের প্রতিটি সদস্য প্রায় দুই মণ করে মধু পেয়েছিলেন, যা বিক্রি করে ভালো আয় হয়েছে। এবারও তারা আশাবাদী, তবে বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অপহরণের ঝুঁকি থাকায় তারা নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বন বিভাগ জানিয়েছে, মধু আহরণের জন্য মৌয়ালদের ১৪ দিনের পাস দেওয়া শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের জন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মৌমাছি তাড়াতে আগুন বা রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ, বনজ সম্পদের ক্ষতি না করা, নদীতে বিষ প্রয়োগ না করা এবং বন্যপ্রাণী শিকার থেকে বিরত থাকা। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার গাছে ফুলের আধিক্য থাকায় মধু উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং মৌয়ালদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তবে জুন মাস থেকে তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় মৌসুমের পুরো সময়জুড়ে মধু সংগ্রহ সম্ভব হয় না। বিশেষ করে সুন্দরী ও গেওয়া গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় উৎপাদনে প্রভাব পড়ে।
সব মিলিয়ে আশা ও শঙ্কার মধ্যেই শুরু হলো সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী মধু আহরণ মৌসুম। মৌয়ালদের চোখ এখন নিরাপদ ও সফল একটি মৌসুমের দিকে।









