এবিএনএ: ইরানের চলমান বিক্ষোভ ও দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই সতর্ক করেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে পারে। তখন পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও বর্তমানে ইরানে সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেবেন—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ নিশ্চিত নন। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপেক্ষা ও অনুমানের মধ্যেই সময় কাটছে।
রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, তিনি একাধিক কঠোর বিকল্প বিবেচনায় রেখেছেন। মঙ্গলবার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে তাকে বিস্তারিত অবহিত করবেন বলে জানা গেছে। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক অভিযানের ‘সাফল্য’ ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তিনি সেই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ইরান প্রশ্নেও সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এবার সরাসরি হামলা, লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক পদক্ষেপ কিংবা সাইবার ও মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী গোপন অভিযানের মতো বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হবে ইরানের শাসন কাঠামোকে বিভ্রান্ত ও দুর্বল করা। তবে ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ইরানের ক্ষেত্রে কম।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান ভেনেজুয়েলার মতো রাষ্ট্র নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও সংকট সামলানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। একজন নেতাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালালেই পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
ট্রাম্প সম্প্রতি ১৯৮০ সালে ইরানে ব্যর্থ মার্কিন অভিযানের উদাহরণ টেনে সতর্কতার কথাও বলেছেন। সেই অভিযানের ব্যর্থতা শুধু সামরিক ক্ষতিই নয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেও প্রভাবিত করেছিল। ওই অভিজ্ঞতা এখনো ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছায়া ফেলছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক উইল টডম্যানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের আসল লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি শাসন পরিবর্তনের চেয়ে ইরানের আচরণে প্রভাব ফেলতে চায়। এর মধ্যে পারমাণবিক আলোচনায় ছাড় আদায়, দমনপীড়ন বন্ধ এবং সংস্কারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খোলার চেষ্টা থাকতে পারে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে আলোচনায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। যদিও হোয়াইট হাউস বলছে, প্রকাশ্য বক্তব্য ও গোপন বার্তার মধ্যে ফারাক রয়েছে। এ কারণে কূটনীতি আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিক্ষোভে রক্তপাত অব্যাহত থাকলে কূটনৈতিক উদ্যোগ দুর্বলতার বার্তা দিতে পারে বলেও মত রয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সীমিত সামরিক অভিযান বিক্ষোভকারীদের সাহস জোগাতে পারে এবং শাসকদের জন্য কঠোর সতর্কতা হয়ে উঠবে। আবার একই সঙ্গে এটি শাসনব্যবস্থাকে আরও ঐক্যবদ্ধও করতে পারে।
এই সব ঝুঁকি বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।