মুহাম্মদ ইরফান সাদিক
ইরান যুদ্ধের ধাক্কা শুধুমাত্র তেহরান, তেলআবিব বা ওয়াশিংটনের দেয়ালেই আটকে নেই, এ যুদ্ধ যেমন মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, একই সাথে এর আঁচ লেগেছে পুরো বিশ্বের রাজনীতিতেও। প্রথাগত পশ্চিমা মিত্রদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক মিত্র কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর দেশগুলো যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করলে তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিতে পড়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ। পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই তীব্র যে বিগত ৩০ মার্চ জি-৭ জরুরি বৈঠকে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে “সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে এখন যুদ্ধ শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে, জ্বালানি থেকে কৃষি কীটনাশক, কূটনীতি থেকে মিত্র-জোটের রাজনীতি সবদিকে। এরচেয়েও বড় মেরুকরণ এসেছে পশ্চিমা-নির্ভর রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সহায়তা, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, ও পশ্চিমা-জোট সঙ্গী দেশগুলোর রাজনীতি ও পররাষ্ট্র নীতিমালাতে।
যুদ্ধের ফলে প্রথম মেরুকরণ এসেছে ইউরোপীয় দেশগুলোয়। বিশেষত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীলতা ও সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তার ধারণা অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। অবশ্য ন্যাটোকে এমন ভঙ্গুর ও অবিশ্বস্ত জোট করে তোলার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই দায়ী। ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, “এই (ইউক্রেন) যুদ্ধ আমাদের নয়, এটা বাইডেনের যুদ্ধ।” একইসাথে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকিকে ওভাল অফিসে ডেকে নিয়ে লাইভ মিটিংয়ে রীতিমতো অপমান করেছিলেন তিনি। যা আটলান্টিকের জোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য ছিলো সতর্কতা সংকেত ও ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের শুরু। একই সাথে গ্রীনল্যাণ্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বিতর্কিত আচরণ ন্যাটোকে ওয়াশিংটন থেকে অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এমন অনির্ভরযোগ্য আচরণের ফলে, ইরান যুদ্ধের শুরুতেই স্পেন প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে মার্চের ৩ তারিখে ঘোষণা দেয় তারা এই যুদ্ধে তারা অংশগ্রহণ করবে না; একই দিন ট্রাম্প স্পেনকে পাল্টা হুমকি দেন, স্পেনের সাথে সকল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার। কিন্তু, স্পেনের সাথে সুর মিলিয়ে পরদিনই ইতালি ও যুক্তরাজ্যও যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দেয়। ফলে মার্কিন-ইউরোপীয়, বিশেষত ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুদ্ধের এক মাস পর, এপ্রিলের এক তারিখ ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ইউরোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে কোনপ্রকার সামরিক সহায়তা দেবে না, একই সাথে যুদ্ধের প্রয়োজনে কোন আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটিও ব্যবহার করতে দেবে না। একই পথে হাঁটছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যও। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সহায়তা না পেয়ে ট্রাম্প ‘যুক্তরাজ্যের সহায়তার দরকার নেই’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন। আদতে, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী বন্ধের ফলে ইউরোপে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে দ্বিগুণ। আমদানি নির্ভর ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর বেশিরভাগই রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই ওয়াশিংটনকে যুদ্ধে সহায়তা করার চেয়েও ঘরোয়া-রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ সহ নানা ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা বজায় রাখার চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘসময়ের মিত্রদের এমন সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট বার্তা দেয় ন্যাটো আর কোন নিছক পশ্চিমা মূল্যবোধের জোট নয়, বরং তা ক্রমেই শর্তসাপেক্ষ, লেনদেনমুখী এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সমীকরণে ঢুকে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ কানাডাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কানি বলেছেন, ইরানে হামলা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক, যদিও কানাডা ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়; তবুও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ কে কানাডা সমর্থন করে না। এর আগে ট্যারিফ ইস্যুতে তিনি সরাসরি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক উদারবাদ বা ইন্টারন্যাশনাল লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বলতে আর কিছু নেই। আমরা নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করছি।
ওয়াশিংটন যখন যুদ্ধে ইউরোপীয় ও প্রতিবেশী মিত্রদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, তখন ট্রাম্প ভেবেছিলেন দীর্ঘদিনের এশীয় মিত্র জাপানের কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা হয়তো পাবেন। কিন্তু জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের বৈঠক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, একই সাথে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে পার্ল হার্বার আক্রমণকে মনে করিয়ে দিয়ে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছেন ট্রাম্প। জাপান, এশীয় বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশ যার ৯০% তেলই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসে। এক অর্থে, জাপানের সাথে ট্রাম্পের বৈঠক অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের মতো। তিনি ভেবেছিলেন, হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে জাপান হয়তো সহায়তা করবে। কিন্তু, জাপান এরপর দিনই ২মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ‘চাইনিজ ইউয়ান’ ব্যবহার করে নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকালীন সময়ের সকল কূটনৈতিক বৈঠকের প্যাটার্ন দেখলে একট বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি কোয়ার্সিভ বা জবরদস্তিমূলক কূটনীতি পছন্দ করেন। ইরান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রত্যেকটা মিত্রদেরকে তিনি ভেবেছিলেন জবরদস্তি করে পাশে আনবেন, কিন্তু তার একটি কূটনৈতিক বৈঠকও সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে, জবরদস্তিমূলক কূটনীতিকে কখনই কোন স্বাস্থ্যকর বা ভালো কূটনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কারণ, এই ধরনের কূটনীতি দূর্বল রাষ্ট্র ও বশ্যতা স্বীকার করবে এমন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এতোটাও রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া নয় যে জবরদস্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের বশ্যতা স্বীকার করবে, এমনকি জাপানও নয়।
ট্রাম্পের সর্বশেষ চেষ্টা ছিলো চীনের প্রতি সাহায্য চাওয়া, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৭ মার্চ ট্রাম্প প্রকাশ্যে চীনকে হরমুজ প্রণালী খুলতে সহায়তার আহ্বান জানান। কিন্তু, বেইজিং সরাসরি কোন সামরিক, রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি না দিলেও, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেয়নি। বেইজিংয়ের তরফ থেকে ২৬শে মার্চ শান্তি-আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহবান জানানো হয়। পরবর্তীতে, চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগ্যে এপ্রিলের ১ তারিখ যুদ্ধ-বিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া ও শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বিবৃতি আসেনি।
অন্যদিকে, যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করতে যতটা সরব তার ছিটেফোঁটাও আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দেখায়নি। এমন অভিযোগ করেছেন সৌদি আরবের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুলেমান আল আকিলী। তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মিত্র হয়েও আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সকল চিন্তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে। আরবদের নিয়ে নয়।” শুধু যে আরব রাষ্ট্রগুলোই বিশ্বাসঘাতকতা বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তাই না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধে মিসাইল ইন্টারসেপ্টর এর পরিমাণ কমে যাওয়ায়, দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকা ‘থাড ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম’ কে কোরিয়া থেকে সরিয়ে এনে ইরান যুদ্ধে কাজে লাগিয়েছে। ফলে আরবদের পাশাপাশি, দক্ষিণ কোরিয়া, যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন মার্কিনীদের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল ছিলো তারাও চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম বিশ্বব্যাপী এতো ব্যাপক আকারে রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখছে বিশ্ব। বিগত পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে সারাবিশ্বে মোড়লপনা চালিয়ে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভরসা যোগ্য কোন মিত্র বা বন্ধুরাষ্ট্র নয় তা ইরান যুদ্ধে সকলেই টের পেয়েছে। এ যেন ইরানিয়ান প্রবাদেরই প্রতিফলন, “আমেরিকা যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন নেই।”
শিক্ষার্থী
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ও
সিনিয়র ফরেন পলিসি এনালিস্ট
ইয়ুথ পলিসি ফোরাম।