Tag: চলচ্চিত্র ইতিহাস

  • নায়ক হওয়ার আগে ভয় পেয়েছিলেন জসীম, ‘ওমর শরীফ’ মুক্তির পর বদলে যায় ভাগ্য

    নায়ক হওয়ার আগে ভয় পেয়েছিলেন জসীম, ‘ওমর শরীফ’ মুক্তির পর বদলে যায় ভাগ্য

    এবিএনএ: ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের অন্যতম নায়ক জসীম—বাংলা সিনেমায় যিনি খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে গেছেন নিজের যোগ্যতায়। অভিনয়ের জগতে তার সূচনা হয়েছিল রাজ্জাকের সঙ্গে ‘রংবাজ’ ছবিতে, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর ‘রাজ দুলারী’ ছবিতেও খলনায়কের ভূমিকায় দেখা যায় তাকে।

    তবে ভিলেন নয়, নায়ক হিসেবেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিলেন জসীম। সেই স্বপ্ন পূরণে পাশে পেয়েছিলেন নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টুকে। এক সাক্ষাৎকারে ঝন্টু জানান, “আমি জসীমকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—একদিন তাকে নায়ক বানিয়ে সিনেমা তৈরি করব। পরে ‘ওমর শরীফ’ ছবিতে সেই প্রতিশ্রুতি রাখি।”

    নির্মাতার ভাষায়, “জসীমের গানের দৃশ্য নিয়ে আমরা তখন বেশ চিন্তায় ছিলাম। ভাবছিলাম দর্শক তাকে নায়ক হিসেবে গ্রহণ করবে কিনা। কিন্তু সিনেমা মুক্তির পর দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে আমরা অভিভূত হই। গুলিস্তানের হলে দর্শকদের ভালোবাসা দেখে জসীম নিজেও কেঁদে ফেলেছিল।”

    ‘ওমর শরীফ’ সিনেমার পর জসীম আর পিছনে ফিরে তাকাননি। একের পর এক সফল সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করে তিনি জায়গা করে নেন কোটি দর্শকের হৃদয়ে। তার অভিনীত জনপ্রিয় সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘দেবর’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘মহেশখালির বাঁকে’, ‘বাহাদুর’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘মাস্তান রাজা’ প্রভৃতি।

    আজ ৮ অক্টোবর চিত্রনায়ক জসীমের প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৮ সালের এই দিনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জের বক্সনগরে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি অভিনেতা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে লড়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে।

    তার ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী নাসরিন ও তিন সন্তান—রাহুল, রাতুল ও সামী। দুঃখজনকভাবে, চলতি বছরের ২৭ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় জিমে ব্যায়াম করার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ছেলে রাতুল।

  • কবিতা থেকে চলচ্চিত্রে নজরুল: বিদ্রোহী কবির অজানা রূপ

    কবিতা থেকে চলচ্চিত্রে নজরুল: বিদ্রোহী কবির অজানা রূপ

    এবিএনএ:  জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সবাই চিনি বিদ্রোহী কবি, গীতিকার, সুরকার আর গল্পকার হিসেবে। কিন্তু তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি অধ্যায় অনেকটাই অজানা থেকে গেছে—চলচ্চিত্র জগত। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনিকার, গীতিকার এবং সংগীত পরিচালক। বলা যায়, সিনেমার প্রতিটি অঙ্গনেই তাঁর পদচিহ্ন অম্লান হয়ে আছে।

    চলচ্চিত্রে নজরুলের প্রথম পদচারণা

    ত্রিশের দশকে নজরুল যোগ দেন ম্যাডান থিয়েটার্সে ‘সুর ভাঙারি’ পদে। এই দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই চলচ্চিত্রে তাঁর নিয়মিত সম্পৃক্ততা শুরু হয়। তিনি শুধু গান লেখেন বা সুর দেননি, সহশিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন, উচ্চারণ শোধরাতেন এবং সংগীতে দিকনির্দেশনা দিতেন।

    অভিনেতা নজরুল

    ১৯৩৩ সালে পিরোজ ম্যাডান প্রতিষ্ঠিত পায়োনিয়ার ফিল্মসের ‘ধ্রুব’ সিনেমায় দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন নজরুল। নারদকে সাধারণত এক বৃদ্ধ, জটাধারী চরিত্রে উপস্থাপন করা হলেও নজরুল সেটিকে ভেঙে দেন। তিনি নারদকে ফুটিয়ে তোলেন এক তরুণ, সুদর্শন, প্রাণবন্ত রূপে। সমালোচনার মুখেও তিনি বলেন—“নারদ চিরতরুণ, আমি সেই রূপটাই দেখাতে চেয়েছি।” একই ছবির গান ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

    পরিচালক ও কাহিনিকার নজরুল

    নজরুল নিজেই পরিচালনা করেছিলেন ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র এবং দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন। ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাইষষ্ঠী’ ছবিতে ছিলেন সুরকার, আর একই সময়ে ‘জলসা’ ছবিতে নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

    ১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনি ও সুরকার ছিলেন নজরুল। বেদেদের জীবনকাহিনির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ ছবির জন্য তিনি সরাসরি বেদে সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। এ ছবির হিন্দি সংস্করণেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

    সুরকার নজরুলের অবদান

    ১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’, ১৯৩৬ সালের ‘গৃহদাহ’, ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ এবং *‘বিদ্যাপতি’*সহ একাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা ও সুর করেছেন নজরুল। ‘বিদ্যাপতি’ ছবিতে তাঁর সুরারোপিত বৈষ্ণব পদ এখনো অনন্যসাধারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

    ১৯৩৮ সালে শরৎচন্দ্রের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে বিতর্ক হলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নজরুলকে সমর্থন করেন এবং বলেন—“আমার গান কেমন গাইতে হবে, সেটা নজরুলের চেয়ে ভালো আর কে জানবে?”

    প্রযোজক নজরুল

    ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এখান থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও অসুস্থতার কারণে সেগুলো শেষ পর্যন্ত থেমে যায়।

    মৃত্যুর পরও সিনেমায় নজরুল

    ১৯৭৬ সালে নজরুলের মৃত্যু হলেও তাঁর গান ও সাহিত্য অবলম্বনে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ কিংবা ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’—এসব নজরুলসংগীতের ব্যবহার দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

    উপসংহার

    কবিতা, গান ও সাহিত্যের মতো চলচ্চিত্রেও নজরুলের অবদান ছিল বৈপ্লবিক। তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিক প্রকাশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি শুধু বিদ্রোহী কবিই নন, ছিলেন এক অনন্য শিল্পস্রষ্টা—বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক আলোকবর্তিকা।