Tag: কাজী নজরুল ইসলাম

  • বিদ্রোহী কবির চিরনিদ্রার পাশে বিপ্লবীর শেষ ঠিকানা: নজরুলের সমাধিতে শায়িত শহীদ হাদি

    বিদ্রোহী কবির চিরনিদ্রার পাশে বিপ্লবীর শেষ ঠিকানা: নজরুলের সমাধিতে শায়িত শহীদ হাদি

    এবিএনএ: লাখো মানুষের ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত বিদায়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জুলাই বিপ্লবের শহীদ নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি। শনিবার বিকাল সোয়া ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নজরুল সমাধি প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়।

    দাফন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

    শহীদ হাদির দাফনকে কেন্দ্র করে নজরুল ইসলাম সমাধি কমপ্লেক্স ও আশপাশের পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়। টিএসসি, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও সমাধির প্রধান ফটকের সামনে ব্যারিকেড বসানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় মসজিদের একাধিক ফটক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

    এর আগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা এবং সর্বস্তরের জনগণ।

    জানাজার আগে বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শহীদ হাদির আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তার ভাই আবু বকর সিদ্দিকও আবেগঘন কণ্ঠে হাদির সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরে দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।

    জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই সংসদ ভবন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অনেক মানুষ ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নিয়েই জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

    এর আগে সকালে ময়নাতদন্ত শেষে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে হাদির মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে শেষ গোসল সম্পন্ন করে সংসদ ভবনে জানাজার জন্য পাঠানো হয়।

    শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শনিবার সারাদেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি ও আধা-সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।

    ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারির নেতা ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। তিনি আধিপত্যবাদবিরোধী সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।

    গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে নির্বাচনী প্রচারণাকালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন হাদি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শুক্রবার তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

  • কবিতা থেকে চলচ্চিত্রে নজরুল: বিদ্রোহী কবির অজানা রূপ

    কবিতা থেকে চলচ্চিত্রে নজরুল: বিদ্রোহী কবির অজানা রূপ

    এবিএনএ:  জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সবাই চিনি বিদ্রোহী কবি, গীতিকার, সুরকার আর গল্পকার হিসেবে। কিন্তু তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি অধ্যায় অনেকটাই অজানা থেকে গেছে—চলচ্চিত্র জগত। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনিকার, গীতিকার এবং সংগীত পরিচালক। বলা যায়, সিনেমার প্রতিটি অঙ্গনেই তাঁর পদচিহ্ন অম্লান হয়ে আছে।

    চলচ্চিত্রে নজরুলের প্রথম পদচারণা

    ত্রিশের দশকে নজরুল যোগ দেন ম্যাডান থিয়েটার্সে ‘সুর ভাঙারি’ পদে। এই দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই চলচ্চিত্রে তাঁর নিয়মিত সম্পৃক্ততা শুরু হয়। তিনি শুধু গান লেখেন বা সুর দেননি, সহশিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন, উচ্চারণ শোধরাতেন এবং সংগীতে দিকনির্দেশনা দিতেন।

    অভিনেতা নজরুল

    ১৯৩৩ সালে পিরোজ ম্যাডান প্রতিষ্ঠিত পায়োনিয়ার ফিল্মসের ‘ধ্রুব’ সিনেমায় দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন নজরুল। নারদকে সাধারণত এক বৃদ্ধ, জটাধারী চরিত্রে উপস্থাপন করা হলেও নজরুল সেটিকে ভেঙে দেন। তিনি নারদকে ফুটিয়ে তোলেন এক তরুণ, সুদর্শন, প্রাণবন্ত রূপে। সমালোচনার মুখেও তিনি বলেন—“নারদ চিরতরুণ, আমি সেই রূপটাই দেখাতে চেয়েছি।” একই ছবির গান ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

    পরিচালক ও কাহিনিকার নজরুল

    নজরুল নিজেই পরিচালনা করেছিলেন ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র এবং দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন। ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাইষষ্ঠী’ ছবিতে ছিলেন সুরকার, আর একই সময়ে ‘জলসা’ ছবিতে নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

    ১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনি ও সুরকার ছিলেন নজরুল। বেদেদের জীবনকাহিনির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ ছবির জন্য তিনি সরাসরি বেদে সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। এ ছবির হিন্দি সংস্করণেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

    সুরকার নজরুলের অবদান

    ১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’, ১৯৩৬ সালের ‘গৃহদাহ’, ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ এবং *‘বিদ্যাপতি’*সহ একাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা ও সুর করেছেন নজরুল। ‘বিদ্যাপতি’ ছবিতে তাঁর সুরারোপিত বৈষ্ণব পদ এখনো অনন্যসাধারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

    ১৯৩৮ সালে শরৎচন্দ্রের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে বিতর্ক হলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নজরুলকে সমর্থন করেন এবং বলেন—“আমার গান কেমন গাইতে হবে, সেটা নজরুলের চেয়ে ভালো আর কে জানবে?”

    প্রযোজক নজরুল

    ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এখান থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও অসুস্থতার কারণে সেগুলো শেষ পর্যন্ত থেমে যায়।

    মৃত্যুর পরও সিনেমায় নজরুল

    ১৯৭৬ সালে নজরুলের মৃত্যু হলেও তাঁর গান ও সাহিত্য অবলম্বনে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ কিংবা ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’—এসব নজরুলসংগীতের ব্যবহার দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

    উপসংহার

    কবিতা, গান ও সাহিত্যের মতো চলচ্চিত্রেও নজরুলের অবদান ছিল বৈপ্লবিক। তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিক প্রকাশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি শুধু বিদ্রোহী কবিই নন, ছিলেন এক অনন্য শিল্পস্রষ্টা—বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক আলোকবর্তিকা।