মত - দ্বিমত

ছোট-আমি আর বড় আমি

–ড. মো. শওকত হোসেন

সম্ভবত ২০০০ সালের দিককার কথা। আমি তখনকার এক সহকর্মীর বাসায় গিয়েছি আমার ভাগ্নেকে নিয়ে। আমার ঐ সহকর্মী তখন ইংরেজির প্রভাষক, জনাব খালেদ মোশাররফ। আমার বাসা থেকে তার বাসার দূরত্ব এতটাই কম যে, পায়ে হেঁটে তিন মিনিটের মতো সময় লাগে। ভাগ্নের বয়স ছয় এর কাছাকাছি। দু’জনে পায়ে হেঁটে পৌঁছালাম। আমার সহকর্মী আমার ভাগ্নেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ছোট-খাট সাক্ষাতকার চলছে। বিদ্যা প্রদর্শনী করছে ভাগ্নে। তার বিদ্যার বহর তখন বর্ণমালা পর্যন্ত। ইংরেজি বর্ণমালার ছাব্বিশটি অক্ষর একটানা মুখস্ত বললো। আমার সহকর্মী হাততালি দিলো। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ভাগ্নে বললো, “এতো বলেছি বড় হাতের A B C D… এবার বলবো ছোট ছোট হাতের। তাকে থামানো গেল না। ছোট হাতের a b c d… অক্ষরগুলোও সে বললো। আমরা একজন দর্শন ও একজন ইংরেজির শিক্ষক মুগ্ধ হয়ে তার উচ্চারিত ছোট হাতের অক্ষরগুলোও আগ্রহ নিয়ে শুনলাম। কী দারুন একটি অবস্থা। বক্তা বুঝলোই না যে এই ছোট হাত ও বড় হাতের অক্ষর উচ্চারণে সে কি কোনো পার্থক্য দেখাচ্ছে কিনা।

এই যে, একই মানুষ ছোট হাতের অর্থাৎ স্মল লেটার ও ক্যাপিটাল লেটারের ওপর বক্তব্য তুলে ধরেছে, সে তার বক্তব্যের বিষয়টি কিন্তু মনে মনে একটি পার্থক্য দেখিয়েই উপস্থাপন করেছে। মনের আয়নায় সে স্মল লেটার ও ক্যাপিটাল লেটারের আকৃতি মনে মনে চিন্তা করেই তার বক্তব্য দিয়েছে। বলার ক্ষেত্রে এটা যে আলাদা হয় না, সে তা বুঝতে পারেনি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো-এর একটি উল্টো বিষয় মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। এটা আবিষ্কার করেছেন বিখ্যাত একজন ফরাসী মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জ্যাঁক লাঁকা (Jacques Lacan, 1901-1982) তিনি দেখান যে, (বর্ণমালা নয়) খোদ মানুষের দু’টো ভার্সন আছে, ছোট এবং বড়। না, একেবারে, বয়সে ছোট বড়োর কথা বলা হচ্ছে না, ব্যক্তিত্বের ছোট বড়। আমার ‘আমি’ বা প্রত্যেকের ‘আমি’-এর দু’টো রকম আছে, ‘ছোট আমি’ এবং ‘বড় আমি’। কিছুটা ভুল বললাম। লাঁকার মত অনুযায়ী হবে ছোট অন্য (small other) এবং বড় অন্য (big other)। তবে তিনি ‘অন্য’ বললেও বিষয়টি কিন্তু ঘটছে প্রত্যেক ব্যক্তি সত্তার মধ্যে।

একটু খোলাসা করে বলা যাক। আমরা যখন ছোট থাকি, তখন আমাদের জগতও ছোট থাকে। অন্য-অভিজ্ঞতা যা হয় তা আমাদের ‘নিজ’ সম্পর্কে বুঝতে শিখায়। এই যে, নিজের সম্পর্কে অন্য কিছু দিয়ে বুঝবার চেষ্টা এবং ছোট অবস্থায় এটা ছোটই থাকে সেই অবস্থাকে বলা যায়, ছোট অন্য (the little other)। আর বড় হবার সাথে সাথে আমাদের ব্যক্তিত্বে ভাষা, সংস্কৃতি, নানারকম জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা যেভাবে আর এক বৃহত্তর জগত আমাদের মধ্যে তৈরি করে এটা হচ্ছে বড় অন্য (the big other)।

এখন কথা হলো, আলাপ হচ্ছে নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিন্তু ‘অন্য’ (other)   বলা হচ্ছে কেন? এটা বুঝতে হলে লাকাঁর মনোবিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিত্বের ধাপ সম্পর্কিত তত্ত্ব বুঝতে হবে। লাকাঁ প্রত্যেক মানুষের মনোজগত (order) বা ব্যক্তিত্বের তিনটি পর্যায় বা ধাপ (stage) আছে বলে বর্ণনা করেছেন। এই তিনটি স্তর বা ধাপ হলো:

১. কাল্পনিক স্তর (Imaginary or mirror stage/order)

২. প্রতীকী স্তর (Symbolic stage/order)

৩. বাস্তব স্তর (Real stage/order)

কাল্পনিক স্তর বা আয়না স্তর: মানুষ যখন একেবারে শিশু থাকে, তখন এক পর্যায়ে সে নিজের শরীর দেখে নিজের সম্পর্কে এক ধরনের কল্পনা করে। লাকাঁর মতে, ৬ থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে সে এই নিজের সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি করে। বিশেষকরে সে যখন আয়নার মধ্যে বা অন্য কোনো কিছুর মধ্যে নিজের চিত্র দর্শন করে, তখন এইভাবে প্রতিবিম্ব বা ছবি দেখেই ভাবে এটাই পূর্ণাঙ্গ ‘আমি’ বা আমার সত্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই প্রতিবিম্ব মোটেই সম্পূর্ণ নয়, বা এটি একটি ছবি। তার প্রকৃত সত্তার, পুরো অংশ নয়। আর নিজের সম্পর্কে সে যা ভাবে তাও পুরোপুরি সঠিক নয়, এক ধরনের কল্পনা যার অধিকাংশই অমুলক। তার দেহ, মন, ব্যক্তিত্ব কোনোটাই সম্পূর্ণ নয়, অসম্পূর্ণ। অথব সে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ একটি ব্যক্তি সত্তা হিসেবেই ভাবে। আসলে এটা একান্তই তার ছোট চিন্তা, ছোট অভিজ্ঞতা, এমনকি ছোট কল্পনার ‘আমি’। এই ‘আমি’ আ অসম্পূর্ণ অবাস্তব ব্যক্তিসত্তাকে লাকাঁর ভাষায় ‘ছোট অন্য’, the little other বা samall other বলা যায়। ‘অন্য’ বলা হবে এজন্য যে, এটা একান্তই তার নিজের রূপ না, আয়নায় প্রতিবিম্বিত ছবি, অসম্পূর্ণ কল্পনা যা আসলে অন্য কিছু (other)। এই ‘অন্য’ সত্তাকেই সে নিজের পূর্ণ সত্তা রূপে মনে করে, এক ধরনের ছোট ব্যক্তিত্বের তৈরি করে। ছোট হলেও এটা নিজ সম্পর্কে ধারণা, কিন্তু এই আত্মপরিচয় বাইরে থেকেই আসা। তাই এই আমি (ego)-কে ‘ছোট অন্য’ বলা চলে। তবে আর একটি বিষয় এই পর্বে লক্ষণীয়, তা হলো, এটা এক ধরনের ভ্রান্ত পরিচয়। তাছাড়া এটা একক সত্তা কল্পিত হয়, কেননা ছবিটি মূলত সম্পূর্ণই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে মানুষের সত্তা সদা পরিবর্তনশীল, তাই সর্বদাই বলা চলে অসম্পূর্ণ। এটা সুনির্ধারিত কোনো বিষয় নয়, জন্মগত অবস্থাও নয়। মানুষের আত্মপরিচয় আয়না থেকে শুরু করে বাহ্যিক অভিজ্ঞতা বা ‘অন্য’ দ্বারাই নির্মিত হয়। তখনও তার ভাষাজ্ঞান না হওয়ায় ঐ ধারণা বা অনুভূতির কোনো নামও কিন্তু সে দিতে পারে না।

প্রতীকী স্তর (Symbolic stage) : কোনো শিশু যখন ভাষা শিখতে শুরু করে, অন্যের কথা বুঝতে এবং নিজে একটু একটু করে বলতে পারে, তখন শিশুটি একটি প্রতীকী স্তরে প্রবেশ করে। ভাষা এক ধরনের প্রতীক। কোনো নাম বা ধারণার প্রকাশ হোক আর একেবারে অক্ষর হোক, সবই প্রতীক। ভাগনে যে বড় হাত-ছোট হাতের অক্ষরের কথা বলেছে ওগুলোও প্রতীক। এই প্রতীকী স্তরে কেবল ভাষা নয়, মানবসমাজের আচার-আচরণ, বা সংস্কৃতি, আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এই সবই এক একটা বাহ্যিক প্রতীক হিসেবে ব্যক্তির মনের উপর দাগ কাটে। ব্যক্তি ঐ দাগ বা প্রতীক দিয়েই ওগুলোকে বুঝতে শিখে। লালবাতি দেখে গাড়ী থামাতে হবে, সবুজ বাতি জ্বললে চলা যাবে, স্কুলে গেলে বিশেষ পোশাক পড়তে হবে, গান গাইতে হলে তাল-লয় মানতে হবে, শহরে বাড়ী করতে গেলে কর্তৃপক্ষের দ্বারা নক্শা অনুমোদন করাতে হবে, চাকরি করতে হলে অফিসের নিয়ম মানতে হবে, লোক সমাজে কথা বলতে হলে শ্লীলতা বজায় রাখতে হবে, বিয়ে করতে হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে, কোনো অনুষ্ঠানে গেলে নিজের শ্রেণি বা অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট আসনে বসতে হবে, এরকম হাজারো বিষয়ের নমুনা বা প্রতীক ব্যক্তির সামনে ক্রমশ পরিচিত হতে থাকে। এসবই বাইরের জগতের বিষয়। অথচ নিজের মনের গঠন, চিন্তা-চেতনা, অভ্যাস, ইচ্ছা সবই- যা ব্যক্তিত্ব গঠন করে সেগুলো এই বাহ্যিক প্রতীক দ্বারাই নির্ধারিত হয়। এই স্তরে মানুষ তাই ক্রমশ ‘বড় অন্য’ (big other)-এ প্রবেশ করে।

বাস্তব জগত: আমরা যে অর্থে বাস্তবতা বলি এটা বরং তার চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। ব্যক্তির একান্ত নিজের কিছু চিন্তা, কামনা-বাসনা গভীর ভালোবাসা, দুঃখ-কষ্ট, আশা-নিরাশা মানসিক আঘাত অথবা গভীরতম কিছু শোক আছে যা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। বাহ্যিক কোনো প্রতীকের সাথেও মেলানো যায় না। কাউকে কোনো উপমার মাধ্যমেও যথার্থভাবে বোঝানো যায় না, এটা এক অন্যরকম বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মানুষের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। অথচ ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক্। কেউ একজন হয়তো অল্প বয়সে কোনো একটি ছোট-খাট অন্যায় করে ফেলেছে, সেই অপরাধের জন্য অন্য কারো জীবন বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু এখন বড় হয়ে সে ঐ ঘটনা নিজের দিক থেকে এবং যার ওপর ঘটেছে তার দিক থেকেও এটা আর নতুন করে তোলা বিব্রতকর। কাউকেই আপনি এই ছোট ভুলের কথা বলতে পারছেন না, যদিও আপনার নিকট এর বেদনা বেশ জটিল। এই অবস্থা হলো মনের সেই অব্যক্ত বাস্তব অবস্থা। আপনি একে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেন,

“ভাষাহারা মম বিজন রোদনা,

প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা,

চিরজীবনেরই বাণীর বেদনা

মিটিল দোঁহার নয়নে।

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা,

আঁকাশ কুশুম চয়নে।”

এই হলো লাকাঁর বর্ণিত বা আবিষ্কৃত মানব ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন স্তর। এর মধ্যে বাস্তবতার অবস্থাটি একটি ভিন্ন বিষয়। ছোট বড় সত্তার কোনো ব্যাপার নয়। ব্যক্তির পুরোটাই মূলত ‘অন্য’। লাকাঁর মতে, Ego is other (ব্যক্তিসত্তা হলো অন্য)। কাল্পনিক বা আয়না স্তরকে একেবারেই ‘ছোট অন্য’ বলা যায়, আর প্রতীকী স্তরটি মূলত big other বা ‘বড় অন্য’ তৈরি করে। মানুষের সামাজিক সত্তা এই বড় অন্যকে বিকশিত করে। বড় অন্য যার যত প্রসারিত সে ব্যক্তি ততবেশি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। সামাজিক সকল প্রতীক তথা রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন, বাহ্যিক বিভিন্ন জ্ঞান জগতের স্বরূপ, জীবনের বহু ধরন, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা যে যত বুঝতে পারে সে তত বেশি বড় করে তুলতে পারে তার বড় অন্যকে। আসলে এই বড় অন্যই সমাজের মধ্যে ‘বড় আমি’। যেহেতু এটা গঠিত হয় অন্য কিছু দিয়ে, তাই লাকাঁ একে ‘অন্য’ বলেছেন। আত্মসত্তার অবিকশিত পর্যায় হলো ‘ছোট অন্য’, আমাদের ভাষায় বলতে পারি ‘ছোট আমি’। আয়না স্তর হলো এর সবচাইতে ছোট পরিসর।

মানুষ একেবারে শিশু পর্যায়ে ‘ছোট অন্য’ তথা ‘ছোট আমি’ এর মধ্যে থাকতে পারে। কেননা তার বাইরের জগত সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা বা জ্ঞান তখনও হয় না। আমার ভাগনের অবস্থা ঐ সময়কার ইংরেজি বর্ণমালা বলার স্তর যদিও বড় অন্যের পর্যায়ের প্রাথমিক সূচনা পর্ব, কেননা এই স্তরে সে ভাষা শিখতে শুরু করেছে। কিন্তু বড় অন্যের বৃহৎ পর্দা তখনও তার অতটা উল্মোচিত হয়নি। সে বয়সও তার তখন ছিলো না। কিন্তু সমাজে আমরা এমন কিছু মানুষ দেখি যারা বয়সে অনেক বড় হলেও, এমনকি বুড়ো হলেও, পদ-পদবী বড় হলেও চিন্তা-চেতনা আচরণের দিক থেকে ‘ছোট আমি’ বা ‘ছোট অন্যের’ স্তরেই রয়ে গেছেন। যারা সামাজিক নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি, বোঝে না; নিজের মনগড়া অথবা কল্পিত ধারণায় সকলকে বিচার করতে চায়, তারা এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে। এই শ্রেণির মানুষই রাস্তায় চলার সময় লাল-বাতি, সবুজ-বাতি আমলে নিতে চায় না। নিজের প্রয়োজন ও বিশ্বাসকে অন্ধভাবে পালন করে, অন্যের উপরে তা চাপিয়ে দিতে চায়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন তোয়াক্কা না করে নিজের ক্ষমতা আছে বলতে চায়। ‘আমার আসল রূপ দেখেনি, আমি কী করতে পারি তার ধারণা নেই, তারা কী জানে আমি কে?’ ইত্যাদি রকমের কথা বলে। আসলে তারা নিজের অক্ষমতা সম্পর্কেই পর্যাপ্ত সচেতন নয়। বাইরের প্রতীকগুলোর ঠিকমত অর্থও হয়তো বোঝে না। তাইতো অন্যের সংস্কৃতিকে বা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকে বুঝতে চায় না, জাতীয় সংগীত শুনলে কোনো রকম বোধ জন্মায় না, জাতীয় পতাকাকে এক টুকরা কাপড় ছাড়া অন্য কিছু মনে করে না। আসলে এইসকল মানুষ প্রতীকী স্তরে পৌঁছাতে পারেনি ভালোভাবে। তাই ভাষা, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বজগত ইত্যাদির সাথে নিজেকে পর্যান্তভাবে সামঞ্জস্যমূলক করে তুলতে পারেনি। এরা শরীরে বা বয়সে বড় হলেও নিজের মন রয়েছে আয়না স্তরের ‘ছোট আমি’-তে।

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button