মত - দ্বিমত
শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো ও একজন শিক্ষকের গল্প
কম বেতন, বাড়তি দায়িত্ব আর সম্মানের টানাপোড়েনে প্রতিদিন লড়াই করছেন দেশের হাজারো শিক্ষক


এবিএনএ: রবীন্দ্রনাথ আমার শিক্ষাগুরু ছিলেন। এটা আমার জীবনের অত্যন্ত আশির্বাদময় ঘটনা বলে আমি মনে করি। আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় তাঁর সরাসরি পাঠ-গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। আমার হাতে খড়ি হয়েছে যাঁদের হাতে তিনি তাঁদের একজন। সত্যিকারের খড়ি দিয়েই আমার লেখালেখির যাত্রা শুরু হয়েছিলো। বাঁশের খড়ি বা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো কমল, দোয়াত ভরা কয়লা গুলিয়ে বানানো কালি, আর তাল পাতার সরু লম্বা দুই পৃষ্ঠদেশ- এই ছিলো আমাদের স্কুলের বর্ণমালা লিখনের প্রাথমিক উপকরণ। শ্রেণি কক্ষে বসার সৌভাগ্য তখনও হয় নি। কখনও বৃক্ষতলে-রবীন্দ্রনাথ ও রুশোর কাক্সিক্ষত প্রকৃতির কোলে, আবার ঝড়-বৃষ্টি-খড়ায় আমাদের ঠাই হতো বড়োজোর বারান্দায়। প্রথম- শ্রেণি বা যাকে তখন বড় ওয়ান ক্লাস বলা হতো, তার পূর্বে শ্রেণি কক্ষে বসার নিয়ম আমাদের স্কুলে ছিলো না। এর অন্যতম কারণ হলো পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক। আমরা যে শিক্ষা- সরঞ্জাম ব্যবহার করতাম তার সবকিছু, বিশেষকরে দোয়াতের কালি ও তার মধ্যে কঞ্চির কলম ডুবানো- বের করা এবং তালের পাতায় লিখে আবার কাপড় (ন্যাকড়া) দিয়ে মুছে ফেলা- লিখন সংগ্রামের ইত্যাদি কর্ম- সম্পাদনে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা ঝুঁকি থাকাটা স্বাভাবিক। তাছাড়া লিখন- প্রক্রিয়ার যে পদ্ধতি বলা হলো তা কোনো চেয়ার-টেবিল, ব্যাঞ্চ ব্যবহার করে সম্পন্ন করার চাইতে মৃত্তিকার কোলে বসে সম্পাদন করাই অধিকতর সুবিধাজনক ছিলো।
যাইহোক, আমার শিক্ষকের প্রসঙ্গে আসা যাক। বর্ণমালার বর্ণালী জ্ঞান দখল করার দারুন সেই সাধন-যজ্ঞে আমরা সাধনাকারী ছিলাম; প্রতিদিনের পাঠ শেষে আমাদের অবস্থা কম-বেশি ‘বøাক-হোলি’ খেলার মতো হতো। হাতে, জামা-কাপড়ে, এমনকি মুখমন্ডলেও এক একজনের লেগে যেতো কালো কালির নানা আকারের দাগ। ‘দাগ থেকে দারুন কিছু’ হতে পারে- এটা তখনও না বুঝলেও ফলত তাই হয়েছে। আমরা বর্ণমালার জ্ঞান হাতে-কলমে অর্জন করেছি। গায়ে লাগা দাগগুলো মুছে ফেলতাম, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে প্রতিদিন যে দাগ পরতো তা আজও মুছে যায় নি। এই হৃদয়ে লিখনের মহৎ কাজটি করতে, বর্ণমালা শিখার সাধনায় যিনি সাধন-গুরু হিসেবে সযতেœ আমাদের সাথে থাকতেন তিনি হলেন আমার শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ঢালী, আমাদের রবি স্যার। তাঁর হাতে, জামায় লেগে যাওয়া আমাদের কালির দাগ আজও আমার চোখে ভাসে।
বর্ণমালা শিখানোর সাথে সাথে রবি স্যার আমাদের আরও অনেক কিছু শিখাতেন। সুন্দর হাতের লেখা কীভাবে লিখতে হয়, তা তখন থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের তিনি শিখিয়েছেন; অংকন শিক্ষকও ছিলেন তিনি। আমাদের অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বড় অংকন-শিল্পী ও লিখন শিল্পী বলতে তাঁকেই বুঝাতো। তার প্রমাণ হলো ব্যানার লেখা, কোনো দেয়ালে বা ক্যানভাসে কেনো চিত্র অংকন করা, অথবা সখের বসে কোনো রুমাল, হাতপাখা, চাদর, এমনকি নক্শি কাঁথায় নক্শা আকার জন্যও রবি স্যারকেই সবচেয়ে বেশি কাক্সিক্ষত মনে করা হতো। তবে প্রসঙ্গত বলছি, তাঁর নিকট থেকে অক্ষরজ্ঞান শিখলেও খুব ভালো হস্ত লিখন ও চিত্রাঙ্কন শিল্প বিষয়ক দীক্ষা আমি একেবারেই নিতে পারিনি। তার সকল প্রচেষ্টা- প্ররিশ্রম ব্যর্থ ঘোষণা করে আজও আমি লেখনিতে খুবই গরীব, অংকনে অভাবনীয়ভাবে অক্ষম। তবে হ্যাঁ, স্যার আনুসঙ্গিক আরও কিছু শিক্ষা দিতে চেষ্ঠা করেছেন, যার কিছু কিছু আমি অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছি, যেমন কীভাবে বন্ধু বানাতে হয়, ভালো সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়, বিবাদ মিটিয়ে সাময়িকভাবে হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়, অল্প পয়সায় কীভাবে নাস্তা (টিফিন) করা যায়, এমনকি পয়সা না থাকলেও কীভাবে ক্ষুধা মিটানো যায় ইত্যাদি।
আমি যে, বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছি সেই বিদ্যালয় ও তার বিদ্যা দাতাগণ যেমন অনেকেই গরীব ছিলেন, শিক্ষার্থীদেরও সিংহভাগ ছিলো গরীব। টিফিনের সময় কিছু কিনে খাবার যোগ্যতা যখন আমাদের না থাকতো তখন বরি স্যারের বুদ্ধি অনুযায়ী আমরা কেউ কেউ আমলকি চিবিয়ে তারপর পেট ভরে টিউবয়েলের পানি খেতাম। এ এক দারুন অভিজ্ঞতা, পানি তখন অমৃতের মতো উপভোগ্য মনে হতো। আর এজন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাবও বোধকরি পূর্ণ হতো।
গুরু রবীন্দ্রনাথের কথা এখন থাক। তাঁকে নিয়ে আরও অনেক গল্প আছে। নতুন করে আরও অনেক গল্প তৈরি হবারও অবকাশ আছে। কেননা তিনি এখনও জীবিত আছেন। তবে কীভাবে তিনি জীবন যাপন করছেন, আমাদের ক্ষুধা মিটানোর বুদ্ধিদাতা নিজের বৃদ্ধ বয়সে কীভাবে ক্ষুধা মিটাচ্ছেন সেই গল্পে একটু পরে আসছি। তার পূর্বে বলে রাখছি যে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা করতে গিয়ে এরকম অনেক নিবেদিত শিক্ষাগুরুর অকৃত্রিম অবদান মিশে আছে আমার এবং আমাদের অনেকের জীবনে। আজ যারা সমাজে নেত্রীত্ব দিচ্ছেন, বড় বড় পদ-পদবি ধারণ করে গর্বিত জীবন যাপন করছেন, সামাজিক সম্মান অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তাদের জীবনেও এরকম অনেক রবি স্যারের গল্প কম-বেশি নানাভাবে গ্রথিত আছে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই পিছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। ভালোবাসা বলি আর স্বার্থ বলি তার গতি সর্বদাই যেন সামনের দিকে। যে শিক্ষকগণ আমাদেরকে নানাভাবে দক্ষ করে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব ও নেত্রীত্ব দিতে, নীতি নির্ধারণ করতে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন, তাদের জীবন-মান সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কতটুকু রক্ষা করা হচ্ছে? অন্যান্য চাকরি বা পেশার সাথে তুলনা করলে আমাদের দেশের শিক্ষকগণ এমন কি কি পাচ্ছেন যা দিয়ে তিনি নিজের সন্তানদের লেখাপড়া ও সামাজিক অর্থনৈতিক চাহিদা মিটাতে পারছেন? সামগ্রিকভাবে এর উত্তর নেতিবাচক। তাই স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ব্যক্তিগত কোচিং থেকে গুরু করে নানারকম বৈষয়িক কাজের সাথে, এমনকি রাজনীতির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্বল্প সুবিধাদিতে সীমাবদ্ধ না থাকতে পেরে কেউ কেউ বুর্জোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (private university) ভাড়ায় খেটে ক্ষুণিবৃত্তি চরিতার্থ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের সামাজিক তথাকথিত মর্যাদার সাথে মিলিয়ে আর্থিক সুবিধাদি না দেওয়াই এভাবে মেধা বা শ্রম বিক্রি হয়ে যাবার মূল কারণ। আসলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কোনো পর্যায়ের শিক্ষকগণই তাদের বেতন-ভাতা বা সুবিধাদিতে সন্তুষ্ট নন। তাদেরকে তথাকথিত সম্মানের মত্তকা দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নিম্ন শ্রেণির করে রাখা হয়েছে। একজন অধ্যাপকের কি গাড়ী থাকা অনৈতিক? তার গবেষণার জন্য বরাদ্ধ কেমন থাকা উচিৎ? কিন্তু বর্তমান বেতন কাঠামোতে সেই সুযোগ নেই। এঁদের অনেক নবীন ছাত্র-ছাত্রী আজ সরকারি প্রশাসন বা অন্য কিছু ক্যাডারে চাকুরি করে চকচকে গাড়ীতে চড়ে মাঝে মধ্যে শিক্ষকদের সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে অথবা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেও আসেন। তখন এই শ্রেণি বৈষম্য ও রাষ্ট্রের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়।
একজন শিক্ষক যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের তথা অন্যের সন্তানদের দক্ষতা অর্জনের দিকেই নিরলসভাবে নিবেদিত থাকেন, নিজের বৈষয়িক উন্নতির দিকে নজর না দেন, কেবল তথাকথিত সম্মান নিয়েই সরল জীবন যাপন করেন তাহলে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অবস্থা কীরকম হতে পারে? অবসর জীবনও তাদের কেমন কাটে? আমাদের দেশের শিক্ষকদের বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী বিজ্ঞ বাজেট প্রণেতা ও সরকারি নীতি নির্ধাকণগণ কি তা কখনও ভেবে দেখেন? সুযোগ পেলেই শিক্ষকদের দ্বায়িত্ব-কর্তব্য, যোগ্যতা, এমনকি চরিত্র নিয়েও কত কথা বলা হয়। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বদলে এই সকল ক্ষমতাধর প্রশাসকগণই আবার রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত নানা রকম জ্ঞান নিতে বিভিন্ন দেশে প্রমোদ ভ্রমনে যান। আর সেখান থেকে ফিরে, কখনও বিশ্বমানের, কখনও প্রযুক্তি বা কারিগরি দক্ষতা মুখি, আবার কখনও সৃজনশীল ইত্যাদি পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেন। শিক্ষার সত্যিকারের উন্নতি যদি তাদের মাথায় কাজ করতো তাহলে যাতে করে সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ নাগরিকদের সিংহভাগই শিক্ষক হতে চাইবেন এই পরিবেশ তারা নিশ্চিত করতে চাইতেন। কিন্তু কোনো বাজেটেই শিক্ষার জন্য কাক্সিক্ষত বরাদ্ধ রাখা হয় না, বরং শিক্ষার সাথে অন্য কিছু বিষয় জুড়ে দিয়ে, এমনকি ঐ সকল কর্তা-ব্যক্তিদের বিদেশ সফরের ব্যয়ভারও মিলিয়ে ফেলে এক সুভঙ্করের ফাঁকির ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার উন্নতিতে সবচেয়ে যাঁদের জন্য ভাবা দরকার সেই শিক্ষকদের অবস্থার কোনো কাঙ্খিত উন্নতি হয় না।
তবুও অনেক দক্ষ ব্যক্তি ভালোবেসে এক ধরনের মানবসেবার ব্রত নিয়েই শিক্ষকতায় আসেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই দিন শেষে দুর্ভোগের স্বীকার হন। আমার বরি স্যারও তেমন মিশনধারী একজন শিক্ষক। এখন তিনি কৃষক। পিতার সম্পত্তির যেটুকু তিনি পেয়েছেন সেখানে আবাদ করে জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি যাদেরকে অক্ষর জ্ঞান দিয়ে শিক্ষাজীবনের ভীত তৈরি করে দিয়েছেন, তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে অনেক নীতি নির্ধারণ করেন; সেই দোয়াতের কালিও এখন আর তাদের হাতে লাগে না- যন্ত্র দিয়েই লিখতে পারেন। কিন্তু বরি স্যারদের গায়ে তখন যেমন কালি মাখা থাকতো- এখনও তাঁদের গায়ে কাঁদা লাগাতে হয়!
লেখক:- ড. মো. শওকত হোসেন
অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।