সাভারে বাসে আগুন: মালিক-সাংবাদিকসহ আসামি ৪০

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি: ঢাকার সাভারে সড়কের পাশে পার্ক করে রাখা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাসমালিক ও সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পুলিশ। একই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলাটি করেন। মামলার এজাহারে আসামিদের স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় বাসমালিক ও সাংবাদিকের নাম
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাভার পরিবহনের মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে হৃদয় (২৫)। এজাহারে তাকে ছাত্রলীগের সমর্থক এবং ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মো. কামরুজ্জামান খান নামে এক সাংবাদিককেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশের সিনিয়র রিপোর্টার এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য।
তবে কামরুজ্জামান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন এবং বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি অতীতে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারে পুলিশের যে বর্ণনা
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটে সাভারের রেডিও কলোনি ইউটার্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন এসআই আব্বাস উদ্দিন। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে যান।
এজাহারে দাবি করা হয়েছে, সেখানে ৬০ থেকে ৭০ জনের একটি দল একটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন দিচ্ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের অনেকে মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে এবং অন্যরা আশপাশের সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকজনকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হিসেবে শনাক্ত করার দাবিও করা হয়েছে।
পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। স্থানীয়দের সহায়তায় কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
বাসমালিককে নিয়ে মামলায় যে অভিযোগ
এজাহারে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, হাবিবুর রহমান তার মালিকানাধীন সাভার পরিবহনের বাসটি ইঞ্জিন ও গিয়ার বক্স ছাড়া ফুটপাতে পার্ক করে রেখেছিলেন। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নির্দেশনা, সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ এখনো মামলার এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে; তদন্ত শেষে এর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
একজন গ্রেপ্তার
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার রাতেই সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন বাজার এলাকা থেকে সোহেল রানা (৩০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে অগ্নিসংযোগের কথা স্বীকার করেছেন। তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের বক্তব্য
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানিয়েছেন, বিস্ফোরক আইনে ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে কোনো আসামির বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
সাংবাদিককে আসামি করায় ডিআরইউর প্রতিবাদ
সাংবাদিক কামরুজ্জামান খানকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। সংগঠনটি বলেছে, মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ স্পষ্ট নয়।
ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো সাংবাদিককে হয়রানি বা পেশাগত চাপে রাখার উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহার করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। সংগঠনটি বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
কামরুজ্জামানের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাভারে বসবাস করেন না এবং বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ফলে মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
মামলার অভিযোগ, আসামিদের বক্তব্য এবং তদন্তের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় কারা প্রকৃতভাবে জড়িত ছিলেন, তা নির্ধারিত হবে।




