অর্থ বাণিজ্য

এলপিজি আমদানির খরচ বাড়ায় বাজারে ১২ কেজি সিলিন্ডার ২১৫০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:  তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজভাড়া ও ট্রেডার প্রিমিয়াম বাড়ায় নতুন চালান আনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কিছু আমদানিকারক। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ সেপ্টেম্বরের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এই সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ বাজারদর ও নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে ৫৬৫ টাকার ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। বিইআরসি অবশ্য জানিয়েছে, নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই।

চাহিদার তুলনায় কমছে সরবরাহ

খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় এখন পরিবেশকদের কাছ থেকে কম পরিমাণ এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে। আগে যে পরিমাণ সিলিন্ডারের চাহিদা দেওয়া হতো, তার পুরোটা সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকের মতো পণ্য মিলছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

সরবরাহ পেতে সময়ও বেড়েছে। আগে চাহিদাপত্র দেওয়ার পর দ্রুত সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও এখন কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

আমদানিতে বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ

আমদানিকারকদের দাবি, এলপিজি পরিবহনের জাহাজভাড়া এবং ট্রেডার প্রিমিয়াম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টনে এই খরচ প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি এ খাতে ১৬০ ডলার হিসাব করেছিল।

এ কারণে বাড়তি ব্যয়ে এলপিজি আমদানি করলেও সেই অতিরিক্ত খরচ তাৎক্ষণিকভাবে বাজারদরে সমন্বয় করার সুযোগ নেই বলে আমদানিকারকদের একটি অংশ মনে করছে। ফলে কেউ কেউ নতুন চালান আনার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

নির্ধারিত দাম কমলেও বাজারে বেশি

বিইআরসি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা আগস্টের ১ হাজার ৫৯৮ টাকার তুলনায় ১৩ টাকা কম। কমিশনের হিসাবে প্রতি কেজি এলপিজির খুচরা মূল্য ১৩২ টাকা ১২ পয়সা।

দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর সেপ্টেম্বরের কন্ট্রাক্ট প্রাইস, জাহাজভাড়া, ট্রেডার প্রিমিয়াম এবং ডলারের গড় বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরের জন্য প্রোপেনের দাম টনপ্রতি ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৬৬০ ডলার ধরা হয়েছে। ৩৫:৬৫ অনুপাতে গড় সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস দাঁড়িয়েছে ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে এলপিজির চাহিদা

দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। ফলে একদিকে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে এলপিজির সরবরাহ ও দামের চাপ—দুই দিক থেকেই ভোক্তাদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ায় বাজারে সরবরাহের চাপ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও আমদানি ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও তারা সরবরাহ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

সংকট নিয়ে ভিন্নমত বিইআরসির

তবে দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে সাধারণত ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আসে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে তখন পর্যন্ত এসেছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টন।

বিইআরসি চেয়ারম্যানের মতে, বাড়তি প্রিমিয়ামের পেছনে চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব থাকতে পারে। জাহাজভাড়া বেড়েছে এমন তথ্য পাওয়া গেলেও তা দাবিকৃত মাত্রায় বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি ভিন্নমত জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

এলপিজি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আগে থেকেই চাপ ছিল। এর মধ্যে জাহাজভাড়া ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, বেশি খরচে আমদানি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে আমদানি ব্যয় ও নির্ধারিত খুচরা মূল্যের মধ্যে সমন্বয় না হলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হতে পারে।

এদিকে বিইআরসি জানিয়েছে, কমিশনের নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে এলপিজি বিক্রির সুযোগ নেই। সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রয়সহ সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত মূল্যের বেশি নেওয়া আইনসঙ্গত নয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button