জাতীয়

অক্টোবরে তেল আমদানিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন করে অর্থের ব্যবস্থা না হলে আগামী অক্টোবরের কোনো এক সময়ে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলায় অর্থসংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির হাতে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন রয়েছে, যা দিয়ে সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখতে বিপিসিকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বলা হয়েছে। একই সময়ে সরকার সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য অতিরিক্ত ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।

সেপ্টেম্বরের পরই বাড়বে অর্থের চাপ

বিপিসির সর্বশেষ আর্থিক হিসাব বলছে, বর্তমানে সংস্থাটির হাতে থাকা কার্যকরী মূলধন দিয়ে সেপ্টেম্বরের জ্বালানি আমদানির ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু অক্টোবর থেকে আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নতুন অর্থের প্রয়োজন হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিপিসির হিসাবে অন্তত দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ কার্যকরী মূলধন থাকা প্রয়োজন। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় এই ঘাটতি পূরণে আরও প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দামে চাপ

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও। রুট ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি বাড়ায় জ্বালানি সংগ্রহের ব্যয়ও বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় না হলে বিপিসির ওপর লোকসানের চাপ আরও বাড়ে। ফলে আমদানি ব্যয়, শুল্ক ও অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান সংস্থাটির নগদ অর্থের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বাড়তি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন

জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

এই অতিরিক্ত আমদানির মধ্যে গ্যাস অয়েল ও জেট ফুয়েল রয়েছে। প্রস্তাবটি ২০২৬ সালের শেষ চার মাসের বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রায় ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় এসব জ্বালানি সংগ্রহের কথা রয়েছে।

এলসি খোলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

বিপিসির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমদানির এলসি খোলার অর্থ জোগান। পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধন না থাকলে নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিপিসির হিসাবে, নিরাপদ অবস্থানে থাকতে সংস্থাটির হাতে অন্তত দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের অর্থ থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাঙ্ক্ষিত মজুতের তুলনায় অর্থের ঘাটতি রয়েছে।

তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত নেই

জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির লোকসান বাড়লেও আপাতত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেই বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ফলে আমদানি ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান থেকে যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা সামাল দিতে সরকারি অর্থায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিকল্প উৎস খুঁজছে বিপিসি

মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক নৌপথের ঝুঁকির কারণে বিপিসি জ্বালানি সংগ্রহের বিকল্প উৎস নিয়েও কাজ করছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নতুন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের তেলের নমুনা পরীক্ষা করে সেগুলোর সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন সক্ষমতার সামঞ্জস্যও যাচাই করা হয়েছে।

সামনে বড় আর্থিক দায়

জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি বিপিসিকে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে। ফলে সংস্থাটির হাতে থাকা অর্থের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

বিশ্ববাজারের মূল্য পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপিসির আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তা, বাড়তি আমদানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সরকার ইতোমধ্যে বাড়তি জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অক্টোবরের পর বিপিসির অর্থসংকট কতটা সামাল দেওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরকারি অর্থায়ন এবং আমদানি ব্যবস্থাপনার ওপর।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button