আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের স্বীকৃতিতে পাল্টে গেল সমীকরণ—হঠাৎ বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে কেন সোমালিল্যান্ড?

হর্ন অব আফ্রিকার স্বঘোষিত রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য ও পরাশক্তির কূটনৈতিক টানাপোড়েন, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব

এবিএনএ: হর্ন অব আফ্রিকা দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক রাজনীতির একটি উত্তপ্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলের আলোচনায় নতুন করে উঠে এসেছে সোমালিল্যান্ডের নাম। আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং কৌশলগত অবস্থান ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের কারণে স্বঘোষিত এই রাষ্ট্র এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে আলাদা হয়ে সোমালিল্যান্ড একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও এতদিন জাতিসংঘসহ কোনো দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। দীর্ঘ তিন দশক কার্যত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাইরে থাকা এই অঞ্চল শুক্রবার ইসরায়েলের স্বীকৃতি ঘোষণার পর হঠাৎ বৈশ্বিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। সৌদি আরব ও মিশর স্পষ্ট করে জানায়, তারা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে এবং কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে না। তুরস্ক এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু এখন আর কেবল আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে ঘিরে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে নতুন কৌশলগত উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।

ভৌগোলিকভাবে সোমালিল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত এই অঞ্চল দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেন সংঘাত এবং হুথি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটে এই নৌপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় সোমালিল্যান্ডকে একটি সম্ভাব্য স্থিতিশীল নৌ ও সামরিক ঘাঁটির জন্য উপযোগী এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিজস্ব প্রশাসন, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে অঞ্চলটি নিজেকে সোমালিয়ার তুলনায় বেশি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক হিসেবে তুলে ধরছে।

আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই ইস্যুকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে সোমালিল্যান্ডে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্যদিকে চীন ঐতিহ্যগতভাবে বিদ্যমান রাষ্ট্রসীমার পক্ষে থাকলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়াও সামরিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দিক থেকে অঞ্চলটির দিকে নজর রাখছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করলেও অতীতে তিনি বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এদিকে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজসহ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক প্রকাশ্যে সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য ইসরায়েলের ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের দাবি, সোমালিল্যান্ড সোমালিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একতরফা স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

সবকিছু মিলিয়ে, সোমালিল্যান্ড এখন আর শুধু একটি স্বঘোষিত অঞ্চল নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পরাশক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনে এই অঞ্চল বিশ্ব রাজনীতির একটি সংবেদনশীল পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button