ট্রাম্পের নতুন শুল্কে মোড় ঘুরল বৈশ্বিক বাণিজ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির ভবিষ্যৎ কোন পথে?
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাতিল হলো ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’; তবু নতুন আইনে ১০% শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুঁকিতে


এবিএনএ: যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী ও আইনগতভাবে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস–এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের এই রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কযুদ্ধ বড় ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশসহ বহু দেশের জন্য প্রশ্ন রয়ে গেছে—চুক্তির ভবিষ্যৎ তাহলে কী হবে?
এই রায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশি পোশাকশিল্পের জন্যও শুল্কনীতি বড় উদ্বেগের কারণ। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ভিন্ন আইনি পথ ধরে আবার ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। প্রাথমিক হিসাবে বাংলাদেশের ওপর ধার্য শুল্ক ১৯ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নামছে—এটি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন শুল্ক আরোপের ভিত্তি হিসেবে ট্রাম্প যে ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করছেন, তাতে ১৫০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমমান, কর্মপরিবেশ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও বাণিজ্য আচরণ যাচাই করে শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি ছাড় দীর্ঘমেয়াদে উল্টো চাপ হয়ে ফিরতে পারে। এদিকে আদালতের রায়ে আগের পাল্টা শুল্ক-ভিত্তিক চুক্তির কার্যকারিতা প্রশ্নে পড়লেও হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, শুল্ক কাঠামো বদলালেও বাণিজ্য চুক্তির অন্যান্য শর্ত বহাল থাকবে।
২০২৫ সালের নির্বাহী আদেশের পর বাংলাদেশের ওপর উচ্চহারে পাল্টা শুল্ক বসানো হয়েছিল। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ কাঠামোয় শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানো হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, সয়াবিনসহ কৃষিপণ্য এবং বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ—যা দেশীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একাংশ ‘অসম ও চাপিয়ে দেওয়া চুক্তি’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ শুল্কে বাংলাদেশি পোশাকের দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্ডার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল—এতে রপ্তানিখাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য আংশিক স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও এখনই পুরোনো চুক্তি পুনরালোচনায় যাওয়ার সময় নয়। বরং আগামী ১৫০ দিনের মূল্যায়নপর্ব মাথায় রেখে শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, পরিবেশগত মান রক্ষা ও কমপ্লায়েন্সে বাস্তব উন্নতি দেখানোই হবে কৌশলগত প্রস্তুতি। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি যে কোনো সময় বড় ধাক্কা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, আদালতের রায়ে ট্রাম্পের আগের শুল্ক কাঠামো নড়বড়ে হলেও নতুন আইনি পথে শুল্ক বহাল থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সামনে কূটনৈতিক দরকষাকষি, অভ্যন্তরীণ সংস্কার আর বাজার-বৈচিত্র্য—এই তিন দিকেই সমান মনোযোগ দিতে হবে বাংলাদেশকে।




