রোহিঙ্গা সংকটে নতুন শঙ্কা, মানবপাচার ঠেকাতে জাতিসংঘের ১০ প্রশ্ন বাংলাদেশকে

নিজস্ব প্রতিবেদক: রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মানবপাচারের ঝুঁকিও ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। কক্সবাজারের শরণার্থীশিবির থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা—দুই ক্ষেত্রেই পাচার, শোষণ এবং প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিওভান মুলালি, অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক গেহাদ মাদি এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারম্যান-র্যাপোর্টিয়ার ক্লডিয়া ফ্লোরেস বাংলাদেশের কাছে এ বিষয়ে তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের যোগাযোগ নথি BGD 4/2026-এ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির, সমুদ্রপথে অভিবাসন এবং মানবপাচার প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। নথিটি ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
তবে নথিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের কাছে পৌঁছানো অভিযোগ ও তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে তাঁরা কোনো আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। বরং এসব তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা ও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের শিবিরে মানবপাচারের শত শত ঘটনা
নথিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৪০৭টি মানবপাচারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল। এসব ঘটনায় পুরুষ, নারী এবং শিশুরাও ভুক্তভোগী হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ২৪৮ জন পুরুষ, ৮৮ জন নারী, ৪১ জন ছেলে এবং ২৯ জন মেয়ে ছিলেন। একজনের লিঙ্গপরিচয় ভিন্নভাবে নথিভুক্ত করা হয়।
পুরুষ ও ছেলেদের ক্ষেত্রে কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ ধরা, বন ও নির্মাণশ্রমে পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে কারখানার কাজ, গৃহস্থালি শ্রম এবং যৌন শোষণের মতো ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চাকরি, শিক্ষা ও বিয়ের প্রলোভনে ফাঁদ
জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, শিবিরে সীমিত শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগের ঘাটতি রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলছে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারী ও দালালরা চাকরি, শিক্ষা কিংবা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে শিশু ও তরুণদের আকৃষ্ট করছে—এমন তথ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া জোরপূর্বক বিয়ে, শ্রমে বাধ্য করা, যৌন শোষণ, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জোর করে যুক্ত করার ঝুঁকির কথাও নথিতে উঠে এসেছে।
উদ্ধার ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই নিয়েও প্রশ্ন
সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পর তাঁদের পরিচয় ও পাচারের শিকার হওয়ার বিষয়টি কীভাবে যাচাই করা হয়, তা নিয়েও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানতে চেয়েছেন।
তাঁদের উদ্বেগ হলো, মানবপাচারের শিকার কাউকে যথাসময়ে শনাক্ত করা না গেলে তিনি ভুক্তভোগী হিসেবে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার পরিবর্তে অনিয়মিত অভিবাসী বা অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
বাংলাদেশে মানবপাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত ও সহায়তার জন্য জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসী, রোহিঙ্গা ও আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পাচারের লক্ষণ শনাক্তের প্রক্রিয়া সব সময় একইভাবে প্রয়োগ করা হয় কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমুদ্রপথে বাড়ছে বিপজ্জনক যাত্রা
রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে অনিরাপদ যাত্রায় বের হন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি নিহত বা নিখোঁজ হন।
২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেও পরিস্থিতির অবনতি দেখা গেছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৯ জন সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫৬ শতাংশ বেশি।
আন্দামান সাগরে নৌযানডুবির ঘটনায় বড় প্রাণহানি
জাতিসংঘের নথিতে ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে একটি নৌযানডুবির ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। নৌযানটি ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবল বাতাস, উত্তাল সমুদ্র এবং অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌযানটি ডুবে যায়। এতে প্রায় ২৫০ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে জাতিসংঘের নথিতে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
পরে ১১ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্র থেকে কয়েকজনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন। তাঁদের পরবর্তীতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন রোহিঙ্গা ছিলেন। তাঁদের মানবপাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য পাঠানো হয়। অন্যদিকে ছয় বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মানবপাচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও আটকের তথ্য নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালেও ঝুঁকি কমেনি
জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের নথিতে মূলত মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং সমুদ্রপথে জীবন রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, তাঁদের পাচারের শিকার হিসেবে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও বাংলাদেশ সরকারের কাছে তথ্য চেয়েছেন।
বাংলাদেশের কাছে যে ১০ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে—
১. ৯ এপ্রিলের নৌযানডুবির ঘটনা ও এর তদন্তের অগ্রগতি।
২. সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার প্রক্রিয়া।
৩. উদ্ধার ব্যক্তিদের মধ্যে মানবপাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শনাক্ত করার পদ্ধতি।
৪. রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও শিশুদের পাচার থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা।
৫. মানবপাচারের অভিযোগ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের ব্যবস্থা।
৬. পাচারের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া।
৭. ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা।
৮. ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ।
৯. দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও জীবিকার সংকটের মতো পাচারের মূল কারণ মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগ।
১০. পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা ও নিরাপদ, নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগের ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের পদক্ষেপ।
অর্থায়ন কমায় বাড়ছে ঝুঁকি
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানবিক সহায়তা কমে গেলে শিবিরে শিক্ষা, জীবিকা ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। সীমিত জীবিকার সুযোগ, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং নিরাপদ ও বৈধভাবে অন্যত্র যাওয়ার পথের অভাব তাঁদের একটি অংশকে দালাল ও পাচারকারীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
শুধু শরণার্থী সংকট নয়, এখন সামনে নিরাপদ চলাচলের প্রশ্ন
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের নথিতে উঠে আসা তথ্য বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকটি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং সমুদ্রপথে নিরাপদ চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের কাছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নগুলো মূলত পাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা, তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা সম্পর্কে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এসব বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য ও ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করা হয়েছে।


