মহাকালের অবসান: না-ফেরার দেশে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধ্রুবতারা বেগম খালেদা জিয়া
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ জাতি, শেষ হলো রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়


এবিএনএ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ এক গভীর শূন্যতার দিন। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও অবিচল নেতৃত্বের প্রতীক—তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে দলীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এই প্রয়াণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ, বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও দেশবাসীর দোয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত হার মানেন তিনি।
একসময় যিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ ও লাজুক গৃহবধূ, সময়ের প্রয়োজনে তিনিই হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা, এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন হয়ে ওঠে এক অনন্য ত্যাগের ইতিহাস।
১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল রাজনীতিতে আসেন অনিচ্ছায়। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দেশের সংকটময় মুহূর্তে দলীয় নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি রাজপথে নামেন। ১৯৮৩ সালে বিএনপির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক যাত্রা।
স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান তাকে এনে দেয় ‘আপোষহীন নেত্রী’র স্বীকৃতি। দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
তার শাসনামলে শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ ও অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। যমুনা সেতু, মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষা, মোবাইল ফোন খাত উন্মুক্তকরণ—সবই তার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব ও চিকিৎসাবঞ্চনার মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তবু কখনো আপস করেননি, কখনো দেশ ছেড়ে যাননি। তার এই অবিচলতা তাকে ইতিহাসে গণতন্ত্রের এক অমর প্রতীকে পরিণত করেছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের পতনের পর তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পান। মুক্তির পর প্রতিহিংসার পরিবর্তে তিনি আহ্বান জানান শান্তি, সহনশীলতা ও ঐক্যের।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার আদর্শ, সাহস ও ত্যাগ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এবং থাকবেন—এক অটল ধ্রুবতারা।




