জাতীয়

বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের অভিযোগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ; জাতিসংঘের দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ

এবিএনএ: বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত ধারা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতিক ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করছে।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের উচিত এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরে দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যারা চলতি বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার যেন অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফাঁদে না পড়ে। শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত দমন গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।”

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার বন্ধে দ্রুত ভূমিকা নিতে হবে।

সংস্থাটির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই অস্বচ্ছ অভিযোগ আনা হয়েছে। কিছু আটক ব্যক্তিরা পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, যা অতীত সরকারের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি বলে মনে করা হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ঘটে গত ২৮ আগস্ট ঢাকায়, যখন ‘মঞ্চ ৭১’ সংগঠন স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে এক সভা আয়োজন করে। সেখানে হামলার পর পুলিশের বদলে সভায় অংশ নেওয়া ১৬ জনকেই আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান এবং সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

পরে তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, শান্তিপূর্ণ আলোচনাকেই ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত এই আইন এখন শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ এডিটরস কাউন্সিলও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, আইনটির সংশোধন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। যদিও ড. ইউনূস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে দেশের আইন সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জনতার হাতে অন্তত ১৫২ জন নিহত হয়েছেন, যা সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারহীনতার ইঙ্গিত বহন করছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তিন বছরের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য মানবাধিকার রক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের উচিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার বন্ধ করে নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button