ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক, বৈঠকে বসছে বিরোধীরা

নয়াদিল্লি: ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) নিয়ে প্রশ্ন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের খবর—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইন্ডিয়া জোটের নেতারা ৩০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে যৌথ কর্মসূচি ও পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দল সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি তুলেছে। তাদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে এসআইআর কার্যক্রম এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, একটি বহু-সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মত ও পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। কমিশনের দাবি, এসআইআরসহ নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ম মেনেই হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কমিশনের সদস্যদের সম্মতি ছিল।
বিতর্কের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর কয়েক শরিক দলের অবস্থান। লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস)-এর নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ান, রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চার নেতা উপেন্দ্র কুশওয়াহা এবং তেলুগু দেশম পার্টির নেতা লাভু শ্রীকৃষ্ণ দেবরায়ালু নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে বিরোধীদের অভিযোগকে সরাসরি সমর্থন না করলেও ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মনে যেন সংশয় না থাকে, সে জন্য কমিশনের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
চিরাগ পাসোয়ান বলেছেন, নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা কমে যাওয়া গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। উপেন্দ্র কুশওয়াহাও জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্যের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে টিডিপির লাভু শ্রীকৃষ্ণ দেবরায়ালুর বক্তব্য, অন্ধ্রপ্রদেশে এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়েছে; তবে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া জনআস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কমিশন ইস্যুতে সমন্বয়ের চেষ্টা জোরদার হচ্ছে। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ধরন নিয়ে বিরোধী শিবিরে পুরোপুরি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে—এমন তথ্য নেই। কেউ কেউ কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি চাপ বাড়ানোর পক্ষে থাকলেও, নির্বাচন বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ভোটে অংশ না নিলে নির্বাচনী মাঠ একতরফা হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও কিছু বিরোধী দলের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে কমিশনবিরোধী বিতর্কের পাশাপাশি সিইসি নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য নিয়োগের কাঠামো নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তনের পর প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ মনে করে, কমিশনের স্বাধীনতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক এখন শুধু বিরোধী দল বনাম কমিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষমতাসীন জোটের কয়েকটি শরিকও প্রকাশ্যে কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিরোধীরা যৌথ অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে।
আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা, বিরোধীদের আন্দোলনের ধরন এবং এনডিএ শরিকদের অবস্থান কীভাবে বিকশিত হয় তার ওপর। আপাতত সরকার ও বিরোধী—দুই শিবিরই পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে।




