বিনোদন

আলো নিভে গেছে, নীরবতা গ্রাস করেছে: সিনেমার প্রাণকেন্দ্র এফডিসি কি সত্যিই ভূতুড়ে ভবনে পরিণত?

অব্যবস্থাপনা, অচল প্রকল্প ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে ধুঁকছে বিএফডিসি; সাত দশকের ঐতিহ্য এখন অস্তিত্ব সংকটে

এবিএনএ: এক সময় যেখানে প্রতিদিন শোনা যেত “লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন”—আজ সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। ঢাকাই সিনেমার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এখন কার্যত অচল এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুটিং ফ্লোরে নেই ব্যস্ততা, ডাবিং স্টুডিওতে নেই কণ্ঠের কোলাহল, আর ঝলমলে আলোয় ভরা সেই পরিবেশ এখন শুধুই স্মৃতি।

২০২২ সালে শুরু হওয়া বহুল আলোচিত বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি নয়। সংশোধিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবতা নিয়ে সংশয় কাটেনি। ব্যয়ও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকায়।

১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান একসময় দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—যাঁরা দায়িত্বে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই সিনেমার উন্নয়নের বদলে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এর ফলেই ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারিয়েছে এফডিসি।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চরম সংকটে রয়েছে সংস্থাটি। ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিত ভর্তুকি ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এফডিসি। গত এক দশকে সরকার থেকে প্রায় ৮০ কোটি টাকার অনুদান ও ঋণ নিতে হয়েছে। অথচ লোকসান কমেনি; বরং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের মোট লোকসান ছাড়িয়েছে ১৪২ কোটি টাকা।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এফডিসি পিছিয়ে পড়েছে বহু বছর। আধুনিক ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম, এডিটিং সফটওয়্যার কিংবা ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট সুবিধা—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে চরম ঘাটতি। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি পুরোনো ও অচল। ফলে নির্মাতারা বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরঞ্জাম ভাড়া নিতে। শুটিং ও ডাবিংয়ের কাজও বাইরে করাতে হচ্ছে।

বর্তমানে এফডিসিতে কার্যকর শুটিং ফ্লোরের সংখ্যা কমে এসেছে। আগে যেখানে নয়টি ফ্লোর ছিল, সেখানে এখন কার্যত ব্যবহারের উপযোগী মাত্র কয়েকটি। অনেক শুটিং স্পট নষ্ট হয়ে গেছে, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নেই বললেই চলে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, নষ্ট এসি—এসব অভিযোগ এখন নিয়মিত।

এফডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা মনে করে, আন্তরিক উদ্যোগ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি জানিয়েছেন, সেবা মূল্য কমানো ও নিয়ম সহজ করার ফলে সাম্প্রতিক সময়ে আয় কিছুটা বেড়েছে। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে এবং সঠিক পরিকল্পনায় এগোলে এফডিসিকে আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এফডিসিকে বিকল্প ব্যবহারের চিন্তা ও ‘গবেষণাগার’ হিসেবে রূপান্তরের প্রস্তাব। তাঁদের আশঙ্কা, এতে দেশের চলচ্চিত্র শিল্প আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে।

সাত দশকের ঐতিহ্য বহন করা এই প্রতিষ্ঠান এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত মোড়ে। আলো-ঝলমলে অতীত ফিরে আসবে, নাকি এফডিসি সত্যিই রূপ নেবে এক ভূতুড়ে ভবনে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button