জাতীয়নির্বাচনী হাওয়া

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: একযোগে ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ শুরু

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসের প্রথম সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, যেখানে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার অংশগ্রহণ করবেন

এবিএনএ: রাত পোহালেই বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে ২৯৯টি আসনে সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে সাধারণ সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ভোটাররা সংবিধান সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেবেন। শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে স্থগিত রয়েছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে এটি প্রথম সাধারণ নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গঠিত শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মনোনয়নপত্র দাখিল শেষ হয় ৫ জানুয়ারি, বাছাই শেষ হয় ৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় ছিল, পরে জোটের প্রার্থীদের জন্য কিছু ব্যতিক্রম অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে ৫০টি রাজনৈতিক দল এবং ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী, যার মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন দলীয় ও ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আসনভিত্তিক হিসেবে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন ২ জন। প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে, ১১ দলীয় জোট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যথাক্রমে ২৫৮ জন প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

এই প্রথম বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করছে না। ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী মানবতাবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কারণে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত।

নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিটিভি ও বেতারে সব দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনী ভাষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি, মিছিল ও জনসভা বন্ধ। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রবাসী ভোটাররা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রথমবার ভোট দিতে পারছেন। ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ই-কেওয়াইসি ও ফেসিয়াল ভেরিফিকেশন ব্যবহার করে জাল ভোট রোধ করা হয়েছে।

সরাসরি ভোটে অংশগ্রহণের জন্য ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ৪২ হাজার ৭৭৯ প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৪ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া পোস্টাল ভোটের জন্য ১৫ হাজার কর্মকর্তা নিয়োজিত।

নির্বাচন কমিশন ২ হাজার ৯৮ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে, ভোট ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য। প্রতি উপজেলা ও থানায় অন্তত দুই জন করে মোট ১ হাজার ৪৭ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে থাকবেন। এছাড়া ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্টের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

৪২ হাজার ৭৭৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৪০% ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে ঢাকার ১৫টি আসন ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তার জন্য বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, ড্রোন, সিসি ক্যামেরা ও বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে।

এবছর সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী মোতায়েন, যার মধ্যে সেনা, নৌসদস্য, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও র‍্যাব সদস্য অন্তর্ভুক্ত। ইউএভি, ড্রোন ও বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম নজরদারি করা হবে।

দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ভোট পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব পালন করছেন। মোট ৮১টি দেশি সংস্থা ও ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন দেশি পর্যবেক্ষক এবং ৩৯৪ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ বিদেশি সাংবাদিক অংশগ্রহণ করছেন।

নির্বাচনকে ঘিরে যানবাহনের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ভোটের সমস্ত সরঞ্জাম কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে গেছে এবং ভোট কর্মকর্তারা অবস্থান গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ ১৮ মাসের সংস্কার ও প্রস্তুতির পর দেশজুড়ে ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অপেক্ষা করছেন। কালকের ভোটগ্রহণ নির্ধারণ করবে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button