নির্বাচনী হাওয়াবাংলাদেশ

বিদ্রোহী প্রার্থী, ভুল মনোনয়ন আর কোন্দল—বাগেরহাটে বিএনপির দুর্গ ভাঙল জামায়াত

বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটকাটা, বহিরাগত মনোনয়ন ও স্থানীয় অসন্তোষে বাগেরহাটের একাধিক আসনে বিএনপি পিছিয়ে পড়ে; সুযোগ নেয় জামায়াত

এবিএনএ: বাগেরহাটকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীনদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখা হলেও এবারের নির্বাচনে ছবিটা বদলে গেছে। বাগেরহাট-১ (চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট) আসনে ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে—স্বাধীনতার পর প্রথমবার এখানে জয় পায় জামায়াত। স্থানীয় রাজনীতিতে এ ফলাফলকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের নেতা কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। অতীতে তিনি আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউনিটে দায়িত্বে ছিলেন এবং সংখ্যালঘু সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত। মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই বিএনপির তৃণমূলে অসন্তোষ তৈরি হয়। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, দুঃসময়ে মাঠে থাকা একাধিক প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বহিরাগতকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে কেবল ভোটের অঙ্ক কষে। ফলে মাঠের কর্মীরা নিরুৎসাহিত হন।

এ ছাড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএএইচ সেলিম ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানার মতো দুই স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে থাকায় বিভাজন আরও গভীর হয়। ফলাফলে দেখা যায়, বিজয়ী জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর ব্যবধান ছিল অল্প; কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে ব্যবধান স্পষ্টভাবেই পাল্টে যেতে পারত। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মীদের একটি অংশ প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও গোপনে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।

বাগেরহাট-২ আসনেও একই চিত্র। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতিতে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যায়। প্রকাশ্যে দলীয় প্রচারণা থাকলেও আড়ালে ভিন্ন মেরুর তৎপরতা চলেছে বলে দাবি করেন মাঠের কর্মীরা। ভোটের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, বিভক্তি না হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজি, ঘের ও বসতভিটা দখল, নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতার অভিযোগে সাধারণ ভোটারদের একাংশ মুখ ফিরিয়ে নেয়। অনেকেই বলেন, দল জনপ্রিয় হলেও একাধিক গ্রুপে বিভক্ত থাকায় সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয়ে গেছে। আবার মনোনীত প্রার্থীদের অনেককে ভোটাররা ঠিকভাবে চিনতেন না—এটাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনে দীর্ঘদিন পর ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় ছিনিয়ে নেয়। অতীতে জোটের সমীকরণে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার নজির থাকলেও এবার স্থানীয় সংগঠন সক্রিয় থাকায় ফল তাদের পক্ষে যায়।

বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনে মনোনয়ন বিতর্ক নতুন করে ক্ষোভ বাড়ায়। দলবদল করে আসা প্রার্থীকে এগিয়ে দেওয়ায় তৃণমূল নেতারা অসন্তুষ্ট হন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনী ব্যয় ভাগাভাগি ও অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে মাঠে সমন্বয় হয়নি। শেষ পর্যন্ত এর খেসারত দিতে হয় দলকে।

সব মিলিয়ে বাগেরহাটে বিএনপির ভরাডুবির পেছনে তিনটি বিষয় স্পষ্ট: বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটকাটা, স্থানীয় বাস্তবতা না বুঝে মনোনয়ন এবং দলীয় কোন্দল। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুযোগ নিয়েছে—এটাই বলছেন মাঠপর্যায়ের কর্মী ও পর্যবেক্ষকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button